...
...
Next Story

অসমের বন্যা প্রমাণ করল, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই সমাধানের একমাত্র পথ

বন্যা পরবর্তী সময়ে ক্ষতিপূরণ এবং তাৎক্ষণিক ত্রাণ দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বরং দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সেই কথাই প্রমাণ করল অসমের বন্যাপরিস্থিতি।

Published on: Aug 17, 2026, 18:08:27 IST
Advertisement

প্রতি বছরের মতো এবারও বর্ষার প্রলয়ঙ্করী জলে প্লাবিত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অসম। সাম্প্রতিক অসম রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের (ASDMA) দেওয়া সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী, বন্যার তাণ্ডবে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫-এ। যদিও বন্যাকবলিত ৭টি জেলায় জল কিছুটা নামায় প্রভাবিত মানুষের সংখ্যা কমে ৩.৩২ লাখে এসে ঠেকেছে, তবুও ক্ষয়ক্ষতির রূপটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা চরাইদেও, যেখানে ১.৪২ লাখের বেশি মানুষ ঘরছাড়া। এর পরেই রয়েছে শিবসাগর (৯৭,০৭৪ জন আক্রান্ত) এবং জোরহাট (৫৭,৩৭১ জন আক্রান্ত)।

অসমের বন্যা প্রমাণ করল, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন (@himantabiswa)
অসমের বন্যা প্রমাণ করল, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন (@himantabiswa)

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিচারে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মৃতদের পরিবারপিছু সরকারি অনুদান বা সাহায্য ৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯ লাখ টাকা করার ঘোষণা করেছেন এবং অর্থ সাহায্য দ্রুত পৌঁছাতে প্রশাসনিক নিয়মাবলীতে বিশেষ শিথিলতা এনেছেন।

১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ১৯৫০ সালের মহাশঙ্কটের সূচনা

অসমের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বন্যা নতুন নয়, তবে আজকের এই সংকটের আধুনিক পরিকাঠামোগত উৎসটি লুকিয়ে রয়েছে ১৯৫০ সালের ১৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ৮.৬ মাত্রার আসাম-তিব্বত ভূমিকম্পের মধ্যে।

সেই বিধ্বংসী ভূকম্পন গোটা অঞ্চলের ভূমিরূপ আমূল বদলে দিয়েছিল। ভূমিকম্পের ফলে ব্রহ্মপুত্র এবং তার উপনদীগুলোর তলদেশ উঁচুতে উঠে যায়, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয় এবং নদীপাড়গুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে প্রতি বর্ষায় জীবনের প্রতীক ব্রহ্মপুত্র রুদ্রমূর্তি ধারণ করে ধ্বংসলীলায় মেতে ওঠে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তৈরি মাটি ও বালির বাঁধগুলো বর্তমানে জরাজীর্ণ। অতিবৃষ্টির চাপে এই বাঁধগুলো ভেঙে পড়ে দ্রুত লোকালয় প্লাবিত করে দিচ্ছে।

২. পুনরাবৃত্তির কারণ: ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট ভুল

অসমের বন্যাকে কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রবেশদ্বার (Gateway) হলো অসম।

  • সাপ্লাই চেইন অচল: অসমের জাতীয় সড়ক বা রেললাইন বানের জলে বিচ্ছিন্ন হলে নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম ও ত্রিপুরার মতো পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জোগান স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
  • জাতীয় বাজারে প্রভাব: চা, ধান এবং কাঁচা পাট উৎপাদনে অসমের বিশেষ অবদান রয়েছে। বন্যায় এই ফসল নষ্ট হলে দেশের সামগ্রিক কমোডিটি মার্কেট ও খাদ্য সুরক্ষায় প্রভাব পড়ে।
  • আভ্যন্তরীণ পরিযান: প্রতি বছর ভিটেমাটি হারিয়ে হাজার হাজার জলবায়ু শরণার্থী (Climate Refugees) কাজ ও আশ্রয়ের খোঁজে দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের মেট্রো শহরগুলোতে পাড়ি দেন, যা অন্য শহরগুলোর পরিকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ায়।

৫. স্থায়ী সমাধানের পথ ও নীতিগত পরিবর্তন

ত্রাণ ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে এই স্থায়ী সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী ইঞ্জিনিয়ারিং ও পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ:

  • আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার: পুরনো মাটির বাঁধের জায়গায় ভূ-বস্ত্র (Geotextile) এবং আধুনিক কংক্রিট প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন।
  • নদী ড্রেজিং (Dredging): ব্রহ্মপুত্রের বুক থেকে নিয়মিত পলি তুলে নদীর নাব্য ও জল ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে।
  • জলাভূমি পুনরুজ্জীবন: প্রাকৃতিক জলাভূমি ও বিলগুলোকে রক্ষা করতে হবে, যা আগে অতিরিক্ত জলের প্রাকৃতিক আধার হিসেবে কাজ করত।
  • আন্তঃরাজ্য তথ্য আদান-প্রদান: অরুণাচল ও মেঘালয়ের মতো রাজ্যগুলোর সাথে স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া নজরদারি ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের জল ছাড়ার তথ্যে স্বচ্ছতা আনা দরকার।

অসমের এই বার্ষিক দুর্যোগকে এতদিন এক স্থানীয় ঋতুভিত্তিক ঘটনা হিসেবে দেখা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেবল মৃতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে সমস্যার লক্ষণ ঢাকা যায়, ব্যাধির চিকিৎসা হয় না। অসমের এই বার্ষিক বন্যাকে ‘জাতীয় বিপর্যয়’ (National Disaster) ঘোষণা করে দীর্ঘমেয়াদী বাজেট ও পরিকাঠামোগত পরিকল্পনা গ্রহণ করাই অসম ও ভারতের জন্য একমাত্র টেকসই ভবিষ্যতের পথ।

তথ্যসূত্র:

লাইভ মিন্ট: Assam Floods: Ex-Gratia Norms Hiked to 9 Lakh as Fatalities Reach 75 (https://www.livemint.com/news/assam-floods-cm-himanta-biswa-sarma-steps-up-relief-efforts-as-7-new-fatalities-push-death-toll-to-75-11785315006299.html)

হিন্দুস্তান টাইমস: Assam Govt Hikes Relief Compensation and Relaxes Norms (https://www.hindustantimes.com/india-news/assam-govt-hikes-ex-gratia-for-flood-victims-kin-relaxes-norms-for-compensation-101785263702701.html)

(মতামত ব্যক্তিগত)

 
SHARE THIS ARTICLE ON
Hindustantimes wants to start sending you push notifications. Click allow to subscribe