অভিষেক কোলে

যে কোনও ফর্ম্যাটের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের সব থেকে বড় জয় সন্দেহ নেই। পূর্ণ শক্তির অস্ট্রেলিয়াকে তাদের ঘরের মাঠে টেস্টে পর্যুদস্ত করার কথা শাকিব-তামিম-সহ সেরা সময়ের বাংলাদেশ দলও স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিল কিনা, তা নিয়ে সংশয় থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু তার পর...?
এমনটা নয় যে, এর আগে বাংলাদেশ কখনও অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টেস্ট জেতেনি। ২০১৭ সালে মীরপুরের খোঁয়াড়ে স্পিনারদের লেলিয়ে দিয়ে অজিদের ২০ রানের সংক্ষিপ্ত ব্যবধানে পরাজিত করে মুশফিকুর রহিমের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ। সেটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সার্বিকভাবে পঞ্চম প্রচেষ্টায় এবং নিজেদের ডেরায় তৃতীয় প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। তবে এবার প্যাট কামিন্সদের বিরুদ্ধে ডারউইনে বাংলাদেশের ৯ উইকেটে জয় তুলে নেওয়া টেস্টের ইতিহাসের সব থেকে বড় অঘটন হিসেবেই বিবেচিত হতে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটমহলে।
এমনিতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ঘরে-বাইরে খুব বেশি টেস্ট খেলার সুযোগ হয়নি বাংলাদেশের। তারা নিজেদের দেশে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে মোট ৪টি টেস্ট খেলেছে। মীরপুরের জয় ছাড়া বাকি তিনটি টেস্টে প্রত্যাশা মতোই অজিদের কাছে ল্যাজেগোবরে হয়েছে বাংলাদেশ। এই সফরের আগে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে অ্যাওয়ে সিরিজে ২টি টেস্ট খেলেছিল বাংলাদেশ। দু’টি টেস্টেই তারা ইনিংসে পরাজিত হয়। তাই এবার ডারউইনে আন্ডারডগ হিসেবেই মাঠে নামেন নাজমুল হোসেন শান্তরা। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের টেস্ট জয়ের কথা কল্পনাও করতে পারেননি ক্রিকেটপ্রেমীরা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আঁতে ঘা পড়তেই হৃত সম্মান পুনরুদ্ধারে মরিয়া দেখায় অস্ট্রেলিয়াকে। পরবর্তী ম্যাকে টেস্টে বাংলাদেশকে মাত্র ২ দিনের মধ্যেই গুঁড়িয়ে দিয়ে সেই কাজ সাফল্যের সঙ্গেই সম্পন্ন করেন কামিন্সরা। ম্যাকেতে বাংলাদেশকে এক ইনিংস ও ৫১ রানে হারিয়ে দেয় অস্ট্রেলিয়া। মাত্র ৭৫০ বলেই টেস্টের ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যায়। দুই ইনিংসেই বাংলাদেশকে ১০০ রানের গণ্ডি টপকাতে দেয়নি অজিরা। অর্থাৎ, শান্তদের ব্যাটে বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ দেখা যায়নি এই টেস্টে। অথচ, ডারউইনের বিরাট জয় থেকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস সংগ্রহ করে নেওয়া উচিত ছিল মুশফিকদের।
{{/usCountry}}উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আঁতে ঘা পড়তেই হৃত সম্মান পুনরুদ্ধারে মরিয়া দেখায় অস্ট্রেলিয়াকে। পরবর্তী ম্যাকে টেস্টে বাংলাদেশকে মাত্র ২ দিনের মধ্যেই গুঁড়িয়ে দিয়ে সেই কাজ সাফল্যের সঙ্গেই সম্পন্ন করেন কামিন্সরা। ম্যাকেতে বাংলাদেশকে এক ইনিংস ও ৫১ রানে হারিয়ে দেয় অস্ট্রেলিয়া। মাত্র ৭৫০ বলেই টেস্টের ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যায়। দুই ইনিংসেই বাংলাদেশকে ১০০ রানের গণ্ডি টপকাতে দেয়নি অজিরা। অর্থাৎ, শান্তদের ব্যাটে বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ দেখা যায়নি এই টেস্টে। অথচ, ডারউইনের বিরাট জয় থেকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস সংগ্রহ করে নেওয়া উচিত ছিল মুশফিকদের।
{{/usCountry}}বলের নিরিখে এটি ইতিহাসের চতুর্থ ক্ষুদ্রতম টেস্ট। এর আগে টেস্টের ইতিহাসের মাত্র ৩টি ম্যাচে এর থেকে কম বলে ফলাফল নির্ধারিত হয়েছিল। সেই নিরিখে বাংলাদেশের এটি সব থেকে বড় টেস্ট হার। অর্থাৎ, সব থেকে বড় টেস্ট জয়ের পরেই বাংলাদেশ সাক্ষী থাকে সব থেকে বড় হারের।
প্রসঙ্গটা বাংলাদেশের গৌরবের জয় বা লজ্জার হারের নয়। আসলে এই সাপ-সিঁড়ির লুডোর মতো অনিশ্চয়তাই বরাবর প্রশ্নের মুখে ফেলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে। ধারাবাহিকতার লেশমাত্র নেই বাংলাদেশের খেলায়। কখনও ছিলও না। শক্ত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জয় যে কোনও দলের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। তাদের মধ্যে বিশ্বাসের সঞ্চার করে যে, হ্যাঁ আমরাও পারি। বড় দলকে হারানোর ক্ষমতা যে বাংলাদেশের আছে, সেটা বোঝা গিয়েছে অতীতেও। তবে ধারাবাহিকতার প্রশ্নে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে বিগ জিরো দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। একটা বড় জয়ের পরেই ব্যর্থতার এমন অতলে তলিয়ে যায় তারা, তাতে আত্মবিশ্বাস দুমড়ে মুচড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।
২০১৭ সালে মীরপুরে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ২০ রানে ম্যাচ জয়ের পরে চট্টগ্রাম টেস্টেই ৭ উইকেটে হেরে বসে বাংলাদেশ। চলতি বছরেই অর্থাৎ ২০২৬-এ পাকিস্তানকে ঘরের মাঠে ২ টেস্টের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ। তবে তার পরেই হারারে টেস্টে জিম্বাবোয়ের মতো দুর্বল দলের কাছে ইনিংসে হারেন শান্তরা।
২০১৮ সালে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে পরপর ৩টি টেস্ট জেতে বাংলাদেশ। তবে ঠিক তার পরেই সিলেটে জিম্বাবোয়ের কাছে পর্যুদস্ত হয় তারা। ২০১৬ সালে মীরপুরে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট জেতে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামে সিরিজের পরের ম্যাচে হারতে হয় তাদের।
আফগানিস্তান-আয়ারল্যান্ডসহ বাকি ১১টি টেস্ট খেলিয়ে দেশের বিরুদ্ধেই দীর্ঘতম ফর্ম্যাটে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ। একমাত্র আইরিশদের বিরুদ্ধে ৩টি টেস্ট খেলে একটিতেও হারেনি তারা। নাহলে অন্য ১০টি দেশের কাছের টেস্ট হারের মুখ দেখতে হয়েছে তাদের। এমনকী আফগানিস্তানও টেস্টে হারিয়েছে বাংলাদেশকে। এখনও পর্যন্ত জিম্বাবোয়ের কাছে ৯টি টেস্টে পরাজিত হয়েছে তারা।
ভারতের বিরুদ্ধে ১৫ বারের প্রচেষ্টাতেও এখনও কোনও টেস্ট জেতেনি বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ১৬টি টেস্ট খেলেও এখনও জয় অধরা তাদের। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ২৮টি টেস্ট খেলে মাত্র ১টি জিতেছে বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৯টি টেস্টে মাঠে নেমে ২ বার জয়ের স্বাদ পেয়েছে তারা। সুতরাং, এমন পরিসংখ্যানই বাংলাদেশকে কখনও টেস্ট ক্রিকেটে সমীহ এনে দিতে পারেনি। একটা বড় জয়েই তাদের আত্মতুষ্টি গ্রাস করে কিনা, এমন প্রশ্ন উঠে আসা স্বাভাবিক।
উল্লেখ্য, গত ১৩-১৬ অগস্ট ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সিরিজের প্রথম টেস্টে ৯ উইকেটে জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়া তাদের দুই ইনিংসে যথাক্রমে ১৯৮ ও ২৮৪ রান করে। বাংলাদেশ তাদের প্রথম ইনিংসে তোলে ৪২৬ রান। শেষ ইনিংসে ১ উইকেটে ৫৭ রান তুলে ম্যাচ জিতে যায় তারা।
ঠিক পরেই ২২-২৩ অগস্ট ম্যাকে টেস্টে বাংলাদেশকে এক ইনিংস ও ৫১ রানে বিধ্বস্ত করে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়া একটি মাত্র ইনিংসে ব্যাট করে ২১০ রান তোলে। তবে বাংলাদেশ তাদের দুই ইনিংসে অল-আউট হয় যথাক্রমে ৬৪ ও ৯৫ রানে।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখকের মতামত ব্যক্তিগত)