গ্যাসের ঘাটতি, একের পর এক কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে বিপর্যয় এবং বাড়তে থাকা লোডশেডিং—জ্বালানি সংকট যেন ক্রমেই আরও গভীর হচ্ছে বাংলাদেশে। দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে গ্যাসের ঘাটতিতে শিল্প, বিদ্যুৎ, রান্না এবং পরিবহণ—সব ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবার এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হলেও, সেই গ্যাসও মূলত আমদানিনির্ভর। অর্থাৎ দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা কতটা বাইরে থেকে আসা সরবরাহের উপর নির্ভরশীল, তা ফের স্পষ্ট হয়ে গেল।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ নেমে এসেছে ২৩৭ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি। সোমবার থেকে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ২৫৫ কোটি ঘনফুটে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। তাতেও চাহিদা ও জোগানের বিশাল ফারাক পুরোপুরি মিটবে না।
এই সংকটের অন্যতম কারণ এলএনজি আমদানিতে টানাপোড়েন। সাধারণত মাসে গড়ে ১০টি এলএনজি কার্গো আনা হলেও গত জুলাই-আগস্টে যেখানে ২১টি কার্গো এসেছিল, এবার এসেছে মাত্র ১৫টি। সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে নির্ধারিত কয়েকটি কার্গো সময়মতো না আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। ফলে বেশি দামে খোলাবাজার থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
আন্তর্জাতিক বাজারেও দাম বেড়েছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে এশিয়ার স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে ২৮ ডলারেরও বেশি হয়েছে বলে বাংলাদেশের জ্বালানি বিভাগের তথ্য। ফলে আমদানিনির্ভর গ্যাস ব্যবস্থার উপর চাপ আরও বাড়ছে। সামনে শীতকালে ইউরোপের চাহিদা বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
শুধু গ্যাস নয়, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিও এখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা তুলে ধরছে। ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানির ১,৬০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন একসময় ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে গিয়েছিল। পরে দ্বিতীয় ইউনিট চালু হওয়ায় উৎপাদন ফের ১,৪৫০ মেগাওয়াট ছাড়ায়।
{{/usCountry}}শুধু গ্যাস নয়, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলিও এখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বড় দুর্বলতা তুলে ধরছে। ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানির ১,৬০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন একসময় ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে গিয়েছিল। পরে দ্বিতীয় ইউনিট চালু হওয়ায় উৎপাদন ফের ১,৪৫০ মেগাওয়াট ছাড়ায়।
{{/usCountry}}কিন্তু সমস্যা সেখানেই শেষ নয়। বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটও কারিগরি সমস্যায় বন্ধ হয়ে যায়। ১,৩২০ মেগাওয়াটের পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটও বন্ধ। আরেকটি কেন্দ্রে কয়লার ঘাটতিতে উৎপাদন কম। সব মিলিয়ে একাধিক বড় কেন্দ্র তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ দিতে পারছে না।
ফলাফল—লোডশেডিং। শনিবার রাতে বাংলাদেশে লোডশেডিং ৩,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। দিনের বেলাতেও তা ২,৫০০ মেগাওয়াটের বেশি ছিল। শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ পরিষেবাও চাপে পড়েছে।
বাংলাদেশ সরকার অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যেই তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩,৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা জানানো হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বরের পর তেলের সরবরাহ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে এই পুরো পরিস্থিতি একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনছে—দেশের নিজস্ব গ্যাসের উৎপাদন যখন প্রায় এক দশক ধরে কমছে, তখন আমদানির উপর নির্ভরতা বাড়ানোই কি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান? গ্যাস, এলএনজি, কয়লা, এমনকি জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও যদি সরবরাহ ব্যবস্থায় বারবার ধাক্কা আসে, তাহলে বিদ্যুৎ নিরাপত্তা কতটা স্থায়ী থাকবে?
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় তুলনামূলকভাবে বড় ও বৈচিত্র্যময় জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভারত বহু উৎস ও প্রযুক্তির উপর নির্ভর করছে। বিপরীতে বাংলাদেশে বারবার জ্বালানি সরবরাহে ধাক্কা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলির উৎপাদন ঘাটতি দেখিয়ে দিচ্ছে, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব কতটা।
অর্থাৎ ঢাকার কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু আজকের লোডশেডিং সামাল দেওয়া নয়। দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের জোগান, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কয়লা আমদানি এবং এলএনজি নির্ভরতা কমিয়ে একটি স্থায়ী জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করাই বড় পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থতা বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর চাপ আরও বাড়াতে পারে।