Bangladesh Jamaat Chief on India: ভারতের সঙ্গে এবার নাকি ‘লড়াই হবে সমানে সমানে’! বাংলাদেশের সংসদে দাঁড়িয়ে এমনই হুঙ্কার দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির তথা বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান। শেখ হাসিনাকে ভারতে থাকার সুযোগ দেওয়া এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁর এই মন্তব্য এখন নতুন করে চর্চায়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, দিল্লিকে ‘সমানে সমানে’ লড়াইয়ের হুমকি দেওয়ার আগে কি ১৯৭১-এর ইতিহাসটাও একটু মনে করা দরকার নয়?
‘লড়াইসমানে সমানে’

শফিকুর রহমান বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী হলেও সম্পর্ক হবে সমতার ভিত্তিতে। কোনও দেশের অধীনতা বাংলাদেশ মেনে নেবে না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। ভারতকে উদ্দেশ করে তাঁর বার্তা, ‘আলোচনা হবে, লড়াই হবে সমানে সমান।’
কথার জোর অবশ্যই কম নয়। কিন্তু কূটনীতিতে বড় বড় সংলাপ ছোড়ার আগে বাস্তবতার মাটিতে পা রাখা জরুরি। ভারতকে সামনে রেখে ‘সমানে সমানে’ লড়াইয়ের ঘোষণা শুনতে যতটা চড়া, দুই দেশের বাস্তব সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতার তুলনাটি ততটাই কঠিন।
১৯৭১-এর কথা উঠলেই কেন অস্বস্তি?
শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সঙ্গে তাঁর নিজের পুরনো মন্তব্য মিলিয়ে দেখলেই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়। ২০২৪ সালে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থান ছিল পাকিস্তানকে অখণ্ড রাখা। তিনি আরও বলেছিলেন, তাঁরা ভারতের আনুকূল্যে দেশ স্বাধীন হোক—এটা চাননি।
অর্থাৎ আজ যে ভারতকে নিয়ে এত ‘সমানে সমানে’র কথা, সেই ভারতের ভূমিকা নিয়েই তাঁর আগের বক্তব্য ছিল যথেষ্ট সন্দেহপ্রবণ। বরং তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ‘আনুকূল্য’ দেখালে সেটি নতুন এক ধরনের নির্ভরতা তৈরি করতে পারত—এমন আশঙ্কাই তাঁরা করেছিলেন।
আজ ভারতের অবদান স্বীকার, কাল স্বাধীনতার মডেল নিয়ে আপত্তি?
{{/usCountry}}অর্থাৎ আজ যে ভারতকে নিয়ে এত ‘সমানে সমানে’র কথা, সেই ভারতের ভূমিকা নিয়েই তাঁর আগের বক্তব্য ছিল যথেষ্ট সন্দেহপ্রবণ। বরং তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ‘আনুকূল্য’ দেখালে সেটি নতুন এক ধরনের নির্ভরতা তৈরি করতে পারত—এমন আশঙ্কাই তাঁরা করেছিলেন।
আজ ভারতের অবদান স্বীকার, কাল স্বাধীনতার মডেল নিয়ে আপত্তি?
{{/usCountry}}আরও মজার বিষয়, সাম্প্রতিক সংসদীয় বক্তব্যে শফিকুর রহমান নিজেই বলেছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান অস্বীকার করা যায় না। তাহলে প্রশ্নটা স্বাভাবিক—ভারতের অবদান যখন স্বীকারই করা হচ্ছে, তখন সেই দেশকেই ‘লড়াই সমানে সমানে’র ভাষায় চ্যালেঞ্জ করার প্রয়োজনটা কোথায়?
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ছিল বহুমাত্রিক। লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে আশ্রয়, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা এবং শেষপর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া—বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তা মুছে ফেলা যায় না। ফলে আজকের রাজনৈতিক বক্তব্যে সেই ইতিহাসকে সুবিধামতো ছোট করা বা বড় করা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
‘সবাইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব’ থেকে ‘সমানে সমানে লড়াই’?
২০২৫ সালেও শফিকুর রহমান বলেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে “পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে” এবং জামায়াতের নীতি হবে “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়”। তাহলে এক বছরের ব্যবধানে ভাষার এই বদল কেন? বন্ধুত্বের জায়গা থেকে হঠাৎ ‘লড়াই সমানে সমানে’—এ কি কূটনীতি, নাকি ঘরোয়া রাজনীতির জন্য শক্তিশালী রাজনৈতিক শব্দের ব্যবহার?
দিল্লিকে হুমকি দিয়ে কি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হবে?
শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লির মতপার্থক্য থাকতেই পারে। সীমান্তে মৃত্যু নিয়েও বাংলাদেশের প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে বাস্তব স্বার্থই শেষ কথা। ভারতকে হুমকির সুরে কথা বললেই বাংলাদেশ শক্তিশালী হয়ে যায় না। বরং বাণিজ্য, সীমান্ত, জলবণ্টন, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক রাজনীতির মতো বাস্তব বিষয় নিয়ে কার্যকর দর-কষাকষিই একটি রাষ্ট্রের শক্তির পরিচয়।
তাই ‘সমানে সমানে লড়াই’য়ের হুঙ্কার যতই রাজনৈতিক মঞ্চে হাততালি কুড়োক, ইতিহাস কিন্তু অন্য প্রশ্নও তুলছে—১৯৭১-এ ভারতের ভূমিকা নিয়ে যাঁর নিজের বক্তব্য এতটা সংশয়পূর্ণ ছিল, আজ তিনিই যখন দিল্লিকে লড়াইয়ের বার্তা দেন, তখন সেটাকে কি নিছক রাজনৈতিক হুঙ্কার হিসেবেই দেখা হবে না?