ডেঙ্গুর প্রকোপে যখন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাপে, তখন রাজনৈতিক ময়দানে নতুন করে শুরু হয়েছে ‘নাশকতা’র অভিযোগ। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেছেন, নির্বাচিত সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ‘পতিত সরকারের দোসররা’ নানা অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাঁর দাবি, এই গোষ্ঠী নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে দেশকে অস্থির করার চেষ্টা করছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনও নির্দিষ্ট ঘটনা, অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রমাণ প্রকাশ্যে তুলে ধরেননি।

বুধবার বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ডেঙ্গু সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে রিজভী বলেন, সরকারকে বিপাকে ফেলতে এবং দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে একটি মহল সক্রিয়। তাঁর কথায়, এ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। একই অনুষ্ঠানে তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালগুলিতে ডেঙ্গুর পরীক্ষা বিনামূল্যে করার ব্যবস্থা করেছে বর্তমান সরকার।
কিন্তু এখানেই উঠছে একাধিক প্রশ্ন। কারণ, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম ইতিমধ্যেই নিষিদ্ধ। ২০২৫ সালের ১২ মে জারি করা সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেও সেই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে করা একটি রিট হাই কোর্ট খারিজ করে দিয়েছে। অর্থাৎ প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি পরিচালনার সুযোগ আওয়ামী লীগের নেই।
এই পরিস্থিতিতে যে কোনও নাশকতার ঘটনা ঘটলেই তার দায় ‘পতিত সরকারের দোসরদের’ ঘাড়ে চাপানোর রাজনীতি কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তদন্তে নির্দিষ্ট প্রমাণ সামনে আসার আগেই কোনও রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে দায়ী করলে বিষয়টি আরও রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। ফলে রিজভীর অভিযোগকে ঘিরে বিরোধীদের প্রশ্ন, সরকার কি প্রতিটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, আইনশৃঙ্খলার সমস্যা কিংবা জনঅসন্তোষের পিছনে পুরনো সরকারের ছায়া খুঁজে দায় এড়াতে চাইছে?
ডেঙ্গুতে ভয়াবহ পরিস্থিতি
রাজনৈতিক অভিযোগে পাশাপাশি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তব সমস্যা ডেঙ্গু। ৬ অক্টোবরের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক দিনে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা। একই সময়ে ১,৯৯৬ জন নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে মোট হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ২৮১-তে।
{{/usCountry}}রাজনৈতিক অভিযোগে পাশাপাশি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তব সমস্যা ডেঙ্গু। ৬ অক্টোবরের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক দিনে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা। একই সময়ে ১,৯৯৬ জন নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরে মোট হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে ২৮১-তে।
{{/usCountry}}এই পরিস্থিতিতে সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুর এনএস১ পরীক্ষা বিনামূল্যে করার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। জুলাইয়ে সরকার জানিয়েছিল, বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে এই পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হবে। লক্ষ্য ছিল, অর্থের কারণে কেউ যেন পরীক্ষা করাতে দেরি না করেন।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্য সঙ্কটের সময়ে রাজনৈতিক দোষারোপের বদলে প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা কতটা বাড়ানো হচ্ছে? হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো, ওষুধ-পরীক্ষার ব্যবস্থা, মশার উৎস ধ্বংস এবং পুরসভাগুলির নজরদারি—এই বিষয়গুলিই এখন সাধারণ মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘নৈরাজ্যকে প্রশ্রয় নয়’, বার্তা তারেকের
রিজভী দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার কোনও ধরনের নৈরাজ্য বা অপরাধকে প্রশ্রয় দেবে না। কিন্তু সরকারের এই কঠোর অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তরও শেষ পর্যন্ত দিতে হবে প্রশাসনকেই। কারণ, রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, তদন্ত এবং আইনি পদক্ষেপের ফলেই প্রমাণ হবে কোথায় নাশকতার নেপথ্য এবং কারা জড়িত।
আওয়ামী লীগকে ঘিরে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অতীত সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগের আবহে বিএনপির নতুন ‘দোসর’ তত্ত্ব তাই নিছক রাজনৈতিক বয়ান হিসাবেও দেখছেন অনেকে। বিশেষ করে যখন সরকারের সামনে ডেঙ্গু, মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি এবং আইনশৃঙ্খলার মতো একাধিক বাস্তব সমস্যা রয়েছে, তখন পুরনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশানা না করে প্রশাসনের কাজের হিসাব দেওয়াই জনস্বার্থে বেশি জরুরি।