গঙ্গার জলবণ্টন নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ফের নতুন করে টানাপড়েনের ইঙ্গিত। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তিকে এ বার ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে দাবি করলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট নদী বিশেষজ্ঞ মঞ্জুর এ চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য, তিন দশক আগের ওই চুক্তিতে বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতি, নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের বিষয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। তাই পুরনো চুক্তি শুধু নবীকরণ না করে, নতুন বাস্তবতার ভিত্তিতে নতুন সমঝোতা করার প্রয়োজন রয়েছে।
ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে চুক্তির মেয়াদ

১৯৯৬ সালের গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ ৩০ বছর। ফলে চলতি বছরের ডিসেম্বরেই তার নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা। দুই দেশ চাইলে পরবর্তী ৩০ বছরের জন্য চুক্তি চালিয়ে যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের একাংশ এখন সরাসরি নতুন চুক্তির পক্ষে সওয়াল করছেন।
মঞ্জুর এ চৌধুরীর প্রস্তাব, সরাসরি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে না গিয়ে আপাতত তিন বছরের একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা করা হোক। ওই সময়ে নদীপ্রবাহ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত প্রয়োজন নিয়ে নতুন করে গবেষণা করা যেতে পারে। তার ভিত্তিতে তৈরি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কাঠামো।
‘শুধু জল ভাগ নয়, নদী বাঁচানোও জরুরি’
১৯৯৬ সালের চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল শুষ্ক মরসুমে ফরাক্কায় গঙ্গার জল কী ভাবে ভারত ও বাংলাদেশ ভাগ করবে, তার কাঠামো তৈরি করা। কিন্তু নদী বিশেষজ্ঞের মতে, সময় বদলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলাচ্ছে, কোথাও খরা বাড়ছে, আবার কোথাও হঠাৎ অতিবৃষ্টি হচ্ছে। ফলে কয়েক দশক আগের জলপ্রবাহের হিসাবের ভিত্তিতে তৈরি চুক্তিকে হুবহু কার্যকর রাখা ভবিষ্যতে সমস্যার কারণ হতে পারে।
চৌধুরীর অভিযোগ, বর্তমান চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’-এর পাশাপাশি পরিবেশগত প্রবাহ বা ‘ইকোলজিক্যাল ফ্লো’-এর বিষয়ও নেই। তাঁর মতে, নদী থেকে কতটা জল নেওয়া হবে, শুধু সেই হিসাব করলেই চলবে না। গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ, নদীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ভারসাম্যও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
আলোচনায় নেপালকে আনার দাবি
{{/usCountry}}চৌধুরীর অভিযোগ, বর্তমান চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’-এর পাশাপাশি পরিবেশগত প্রবাহ বা ‘ইকোলজিক্যাল ফ্লো’-এর বিষয়ও নেই। তাঁর মতে, নদী থেকে কতটা জল নেওয়া হবে, শুধু সেই হিসাব করলেই চলবে না। গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ, নদীর স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ভারসাম্যও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
আলোচনায় নেপালকে আনার দাবি
{{/usCountry}}নতুন চুক্তির আলোচনায় নেপালকেও যুক্ত করার দাবি তুলেছেন বাংলাদেশের এই নদী বিশেষজ্ঞ। তাঁর যুক্তি, গঙ্গার জলপ্রবাহের ক্ষেত্রে নেপালের নদীগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মরসুমে নেপালের ঘাঘরা, গণ্ডক ও কোশী নদী দিয়ে তুষারগলা জল গঙ্গা অববাহিকায় আসে। ফলে শুধু ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক কাঠামোর মধ্যে বিষয়টি দেখলে পুরো নদী ব্যবস্থার চিত্র ধরা পড়বে না।
বাংলাদেশের প্রাক্তন বিদেশসচিব ফারুক সোবহানও চুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতার কথা বলেছেন। তাঁর দাবি, চুক্তিতে বিরোধ মেটানোর জন্য কার্যকর মধ্যস্থতার ধারা নেই। পাশাপাশি ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের জন্য পদ্মায় একটি ব্যারাজ নির্মাণের বিষয়ে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেছেন, সেটিও পূরণ হয়নি। ফলে নতুন চুক্তির আগে পুরনো প্রতিশ্রুতি ও ব্যবস্থাগুলিরও পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তিনি।
এ দিকে ভারতও চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা শুরু করেছে। গঙ্গা জলচুক্তি নিয়ে বিহারের উদ্বেগের প্রেক্ষিতে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, জলশক্তি মন্ত্রকের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে নিয়ে আন্তঃমন্ত্রক স্তরে আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ ডিসেম্বরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে গঙ্গার জল নিয়ে ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরেও বিষয়টি এখন নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে সামনে প্রশ্ন শুধু চুক্তি নবীকরণের নয়। গঙ্গার জলবণ্টনকে কেন্দ্র করে ভারত, বাংলাদেশ এবং সম্ভাব্য ভাবে নেপাল—এই তিন দেশের বৃহত্তর নদী-সহযোগিতার নতুন কাঠামো তৈরি হবে কি না, সেটাই এখন বড় বিষয়।