লাদাখ-সহ উত্তর সীমান্তে ভারতের কৌশলগত প্রস্তুতির প্রভাব পড়েছে চিনের সেনা মোতায়েনে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ২০২৫-২৬ সালের বার্ষিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ভারতের পক্ষ থেকে লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল বা LAC সংলগ্ন এলাকা এবং প্রচলিত প্রশিক্ষণ ক্ষেত্রগুলিতে ১০টি ব্রিগেড-আকারের বাহিনী মোতায়েন করা আছে। তারপরে উত্তর সীমান্তে চিনা পিপলস লিবারেশন আর্মি বা PLA-র উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

একটি সাধারণ ব্রিগেডে প্রায় ৩,০০০ সেনা এবং সহায়ক ইউনিট থাকে। তবে ভারতীয় সেনার যে ১০টি ব্রিগেড-আকারের বাহিনীর কথা প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, সেগুলি ‘কম্বাইন্ড আর্মস’ বাহিনী—অর্থাৎ পদাতিক, ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি এবং এয়ার ডিফেন্সের মতো বিভিন্ন যুদ্ধক্ষমতা একই কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে। ফলে প্রয়োজন হলে এই ধরনের বাহিনী দ্রুত এবং অপেক্ষাকৃত স্বনির্ভরভাবে অভিযান চালাতে পারে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে উত্তর সীমান্তের বিপরীতে PLA-র মোতায়েনে উল্লেখযোগ্য হ্রাস লক্ষ্য করা যায়। একই সময়ে LAC-এর বিভিন্ন সেক্টর এবং নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ এলাকায় ভারতীয় বাহিনীকে শক্তিশালী ও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রিপোর্টের ভাষায়, উত্তর সীমান্তে ভারতীয় সেনার মোতায়েন ‘মজবুত’ এবং যে কোনও সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত।
এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে ভারত-চিন সীমান্তে সামরিক উত্তেজনা ছিল উচ্চ মাত্রায়। পূর্ব লাদাখে দুই দেশের সেনা দীর্ঘ সময় মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। সেই পরিস্থিতিতে সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর শক্তিশালী মোতায়েন এবং চিনা বাহিনীর বিপরীত দিকে উপস্থিতি—দুই দেশেই সামরিক পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।
তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের রিপোর্ট শুধু সেনা মোতায়েনের কথাই বলছে না। সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক স্তরেও দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ ও জুলাইয়ে Working Mechanism for Consultation and Coordination বা WMCC-এর ৩৩তম ও ৩৪তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সীমান্ত সমস্যা নিয়ে Special Representatives বা SR পর্যায়ের আলোচনাও ফের শুরু হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৫ সালের আগস্টে এই পর্যায়ে দুই দফা বৈঠক হয়েছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে।
{{/usCountry}}তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের রিপোর্ট শুধু সেনা মোতায়েনের কথাই বলছে না। সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক স্তরেও দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ ও জুলাইয়ে Working Mechanism for Consultation and Coordination বা WMCC-এর ৩৩তম ও ৩৪তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সীমান্ত সমস্যা নিয়ে Special Representatives বা SR পর্যায়ের আলোচনাও ফের শুরু হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৫ সালের আগস্টে এই পর্যায়ে দুই দফা বৈঠক হয়েছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে।
{{/usCountry}}দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ২০২৫ সালের আগস্টে চিন সফর। তিয়ানজিনে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন বা SCO শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে মোদীর সফর দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক যোগাযোগের বার্তা দেয় বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।
সামরিক স্তরেও যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। পূর্ব লাদাখে ২০২৫ সালের ২৫ ও ২৬ অক্টোবর ২৩তম Corps Commander Level Meet অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি সীমান্তের বিভিন্ন সেক্টরে Border Personnel Meetings বা BPM-ও নিয়মিত হয়েছে। মন্ত্রকের দাবি, এসব বৈঠক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে হয়েছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে মতবিরোধ বা উদ্বেগের বিষয়গুলি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে।
অর্থাৎ ২০২৫ সালে সীমান্তে একদিকে ভারত তার সামরিক পরিকাঠামো ও বাহিনীকে শক্তিশালী রেখেছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক ও সামরিক সংলাপও চালু রেখেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মতে, এই দুই ধারার সমান্তরাল অগ্রগতিই উত্তর সীমান্তে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
বিশেষ তাৎপর্য হল, এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নয়াদিল্লিতে BRICS সম্মেলনে অংশগ্রহণের পরদিন। ফলে সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি এবং একই সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ—ভারত-চিন সম্পর্কের এই দ্বৈত চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের রিপোর্টের বার্তা যথেষ্ট স্পষ্ট—LAC-এ ভারত কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। শক্তিশালী বাহিনী মোতায়েন রেখে সীমান্ত সুরক্ষা বজায় রাখার পাশাপাশি আলোচনার পথও খোলা রাখা হয়েছে। আর সেই কৌশলের মধ্যেই উত্তর সীমান্তে PLA-র মোতায়েন কমার বিষয়টি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সাফল্যের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।