পাঁচ মাস ধরে চলা ইরান-আমেরিকা সংঘাতের কোনও স্থায়ী সমাধান এখনও মেলেনি। বরং যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই জটিল হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। গত সপ্তাহেও ইরানকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে কীভাবে সম্মানজনকভাবে যুদ্ধ শেষ করা যায়, তিনি সেই পথই খুঁজছেন বলে খবর। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সূত্র উদ্ধৃত করে জানা যাচ্ছে, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়াকে সামনে রেখে সংঘাতের ইতি টানার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন।

‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনায় ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের মূল লক্ষ্য থেকে সরে এসেও যুদ্ধ শেষ করার কথা ভাবা যেতে পারে। অর্থাৎ, যুদ্ধ শুরুর সময় যে পরমাণু প্রকল্প ছিল আমেরিকার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, আপাতত সেই বিষয়টিকে পাশে রেখে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়াকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হতে পারে।
তবে এই পথও সহজ নয়। হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার বিনিময়ে তেহরান একাধিক শর্ত সামনে রেখেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। মার্কিন হামলায় ইরানের যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য কয়েক বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ, ইরানের সীমান্তবর্তী এলাকায় মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার এবং মধ্যপ্রাচ্যের আশপাশের এলাকা থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়ার মতো দাবি রয়েছে ইরানের। ওয়াশিংটন যদি সব শর্ত মেনে নেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক মহলে তা ইরানের কাছে আমেরিকার নতি স্বীকার হিসেবেই দেখা হতে পারে। এই পরিস্থিতি ট্রাম্পের পক্ষে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত অস্বস্তিকর।
ফলে দুই পক্ষের মধ্যে একটি মধ্যবর্তী সমাধান খোঁজার চেষ্টা চলছে বলে খবর। ওয়াশিংটনের কাছে একদিকে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্যদিকে তেহরানের শর্ত মেনে নিয়ে সংঘাত থামালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে আঘাত লাগার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে হরমুজকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে মূল জটিলতা।
{{/usCountry}}ফলে দুই পক্ষের মধ্যে একটি মধ্যবর্তী সমাধান খোঁজার চেষ্টা চলছে বলে খবর। ওয়াশিংটনের কাছে একদিকে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্যদিকে তেহরানের শর্ত মেনে নিয়ে সংঘাত থামালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিতে আঘাত লাগার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে হরমুজকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয়েছে মূল জটিলতা।
{{/usCountry}}ইরানের জন্যও হরমুজ প্রণালী এখন গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি এই সংকীর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে তেহরান চাপ তৈরি করছে বলে অভিযোগ। এর ফলে গত কয়েক মাসের সংঘাতে কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে ইরান। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও জ্বালানি পরিবহণ পথ হরমুজে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাব পড়েছে বিশ্ব তেলের বাজারে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহণ হয়। ফলে জলপথটি দীর্ঘ সময় বন্ধ বা সীমিত থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতেই তার প্রভাব পড়তে পারে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি থেকে শুরু করে পরিবহণ ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মুদ্রাস্ফীতি—সব ক্ষেত্রেই নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে আরও একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনও এগিয়ে আসছে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ভোটের মুখোমুখি হতে হবে তাঁর দলকে। দীর্ঘদিন ধরে চলা কিন্তু স্পষ্ট ফল না পাওয়া ইরান যুদ্ধ আগামী নির্বাচনে ভোটারদের মনোভাব প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ফলে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ট্রাম্পের উপর অভ্যন্তরীণ চাপও বাড়ছে।
তবে ইরান সহজে সমঝোতায় আসবে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তেহরান যদি নিজেদের দাবিতে অনড় থাকে, তাহলে ট্রাম্পের জন্য ‘সম্মানজনক’ভাবে যুদ্ধ শেষ করার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালী দ্রুত খুলে দেওয়া গেলে সেটিকেই কূটনৈতিক ও কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এখন দেখার, দুই পক্ষ শেষ পর্যন্ত আপসের পথে হাঁটে, নাকি হরমুজকে ঘিরে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হয়।