ভোটার তালিকা প্রকাশ নিয়ে অবস্থান বদলাল ভারতের নির্বাচন কমিশন। এত দিন ভোটারদের তথ্যের অপব্যবহার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং ডিজিটাল কারচুপির আশঙ্কা দেখিয়ে সার্চ করা যায় এমন ভোটার তালিকা দেওয়ার বিরোধিতা করেছিল কমিশন। এ বার স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলিকে ভোটার তালিকার খসড়া ও চূড়ান্ত সংস্করণ সহজে পড়া ও অনুসন্ধান করা যায় এমন পিডিএফ আকারে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অবস্থান বদলের পরেও তথ্যের অপব্যবহার ঠেকাতে নতুন কোনও সুরক্ষাব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা।
কী সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের?

গত বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, নির্বাচন কমিশন জানায়, ভোটার তালিকার খসড়া ও চূড়ান্ত সংস্করণ প্রকাশের পর প্রতিটি বুথের তালিকা স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলিকে ছাপানো কপি এবং সহজে পড়া যায় এমন পিডিএফ আকারে দেওয়া হবে। তবে ওই পিডিএফে ভোটারদের ছবি থাকবে না।
আগে রাজনৈতিক দলগুলিকে মূলত স্ক্যান করা ছবি-সম্বলিত পিডিএফ দেওয়া হত। সেখানে কোনও নাম খুঁজে বের করা বা একাধিক তালিকার মধ্যে তুলনা করা বেশ সময়সাপেক্ষ ছিল। নতুন ব্যবস্থায় কম্পিউটারে সহজেই নাম খোঁজা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং ভোটার তালিকার পরিবর্তন খতিয়ে দেখা সম্ভব হবে। ফলে সাধারণ মানুষ ও বুথ স্তরের আধিকারিকদেরও সুবিধা হওয়ার কথা।
আগে কেন আপত্তি ছিল?
২০২৫ সালের জুনে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ভোটার তালিকার একত্রিত, ডিজিটাল ও মেশিনে পড়া যায় এমন সংস্করণ চেয়েছিলেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনের ভোটার তালিকার পাশাপাশি, কখন কী পরিবর্তন হয়েছে, তার সময়-সহ বিস্তারিত তথ্যও দাবি করা হয়েছিল।
কিন্তু সে সময় নির্বাচন কমিশন সেই দাবি মানেনি। কমিশনের যুক্তি ছিল, সহজে অনুসন্ধান করা যায় এমন ডিজিটাল তথ্য থেকে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার হতে পারে। তথ্য বিশ্লেষণের নামে ডেটা সংগ্রহ, গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং ভোটার তালিকায় ডিজিটাল কারচুপির আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছিল।
{{/usCountry}}কিন্তু সে সময় নির্বাচন কমিশন সেই দাবি মানেনি। কমিশনের যুক্তি ছিল, সহজে অনুসন্ধান করা যায় এমন ডিজিটাল তথ্য থেকে ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার হতে পারে। তথ্য বিশ্লেষণের নামে ডেটা সংগ্রহ, গোপনীয়তা লঙ্ঘন এবং ভোটার তালিকায় ডিজিটাল কারচুপির আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছিল।
{{/usCountry}}কিন্তু এ বার সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে কমিশন। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর চলাকালীন একাধিক অভিযোগের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্ক্যান করা নথিতে নাম খোঁজা এবং বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে মিল খুঁজে বের করতে সমস্যা হচ্ছিল। সহজে অনুসন্ধান করা যায় এমন পিডিএফ থাকলে এই কাজ দ্রুত করা সম্ভব হবে।
সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন
নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে স্বচ্ছতার পথে পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও, তথ্যের অপব্যবহার ঠেকাতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা না নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশনের আধিকারিকেরা স্বীকার করেছেন, ভোটারদের ছবি বাদ রাখাই ছিল আগে উল্লেখ করা অপব্যবহারের আশঙ্কা মোকাবিলার একমাত্র সুরক্ষাব্যবস্থা। তবে ভোটার তালিকার বর্তমান সংস্করণেও ভোটারদের ছবি থাকে না।
অন্য দিকে, তৃণমূলের প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ সাকেত গোখলে প্রশ্ন তুলেছেন, এত দিন কেন সহজে পড়া যায় এমন ডিজিটাল তালিকা দেওয়া হয়নি? তাঁর বক্তব্য, ভোটার তালিকা যখন ডিজিটাল পদ্ধতিতেই তৈরি হয়, তখন সেগুলিকে স্ক্যান করা নথিতে পরিণত করার প্রয়োজন কী ছিল?
এসআইআর ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই সিদ্ধান্ত
ভোটার তালিকার তথ্য পরিচালনা এবং নাম সংযোজন, বাদ দেওয়া ও পুনরায় অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরেও মতপার্থক্যের খবর প্রকাশ্যে এসেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। তার পরেই এসআইআর বাতিল এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ শুরু হয়।
সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকা সহজে যাচাই করার সুযোগ বাড়ানোই কমিশনের নতুন সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। কিন্তু এত দিন যে আশঙ্কার কথা বলে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়নি, তা এখন কী ভাবে মোকাবিলা করা হবে, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও সামনে আসেনি। স্বচ্ছতা ও তথ্যের সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন নির্বাচন কমিশনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।