আমেরিকা ও ইরানের সংঘাত এখন আর শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে আর এক ধরনের লড়াই—ভুয়ো তথ্য, বিভ্রান্তিকর দাবি এবং পাল্টা প্রচারের লড়াই। সম্প্রতি ইরানি পরমাণু-সংক্রান্ত এক মিথ্যা দাবি ছড়িয়ে পড়েছিল ভারতের একটি অজ্ঞাতপরিচয় সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইজরায়েল ও আমেরিকার রাজনৈতিক পরিসরে তা পৌঁছে গিয়েছিল। এমনকি সেই দাবি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্যেও উঠে আসে। পরে সেটি শেয়ার করেন রাষ্ট্রসংঘে ট্রাম্প প্রশাসনের মার্কিন দূত মাইক ওয়াল্টজও।
ঘটনার সূত্রপাত ৫ আগস্ট সকালে। ভারতের একটি X অ্যাকাউন্টে দাবি করা হয়, ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা IRGC-এর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ ভাহিদি নাকি বলেছেন, আমেরিকা ও ইজরায়েলের হাতে পরমাণু অস্ত্র থাকা পর্যন্ত ইরানও পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা ছাড়বে না। পোস্টটির সঙ্গে ভাহিদির ছবি এবং একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-নির্মিত মাশরুম ক্লাউডের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু ওই বক্তব্য ভাহিদি আদৌ করেছিলেন—এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করেছে, এমন প্রমাণও নেই।
তারপরও দাবিটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম ভারতীয় অ্যাকাউন্টটির প্রায় ১ লক্ষ ৭৫ হাজার অনুসারী ছিল। প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে আরও একটি ভারতীয় অ্যাকাউন্ট একই দাবি হিন্দিতে পোস্ট করে। এরপর ইজরায়েলের ‘Mossad Commentary’ নামে একটি অ্যাকাউন্ট সেটি প্রচার করতে শুরু করে। নামের সঙ্গে ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার মিল থাকলেও ওই অ্যাকাউন্টের সঙ্গে মোসাদের কোনও নিশ্চিত যোগাযোগ নেই।
এর প্রায় আধ ঘণ্টা পর ইজরায়েলের Channel 14 সেই কথিত উদ্ধৃতি ইংরেজিতে প্রকাশ করে। সেখানে এটিকে ইরানের পরমাণু বোমা তৈরির প্রথম প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। এরপর নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহুও সেটি ছড়িয়ে দেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দাবিটি পৌঁছে যায় প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বক্তব্যে। জেরুজালেমের মাউন্ট হার্জেলে দেওয়া ভাষণে তিনি দাবি করেন, ভাহিদি স্পষ্টভাবে ইরানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
{{/usCountry}}এর প্রায় আধ ঘণ্টা পর ইজরায়েলের Channel 14 সেই কথিত উদ্ধৃতি ইংরেজিতে প্রকাশ করে। সেখানে এটিকে ইরানের পরমাণু বোমা তৈরির প্রথম প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়। এরপর নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহুও সেটি ছড়িয়ে দেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দাবিটি পৌঁছে যায় প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বক্তব্যে। জেরুজালেমের মাউন্ট হার্জেলে দেওয়া ভাষণে তিনি দাবি করেন, ভাহিদি স্পষ্টভাবে ইরানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
{{/usCountry}}ওয়াশিংটনেও একইভাবে ছড়িয়ে পড়ে খবরটি। মাইক ওয়াল্টজ পোস্টটি শেয়ার করে দাবি করেন, ইরান শেষ পর্যন্ত এমন কিছু স্বীকার করছে যা তাঁর মতে বহুদিন ধরেই স্পষ্ট। ফ্লোরিডার রিপাবলিকান সেনেটর রিক স্কটও পোস্টটি শেয়ার করেন। Fox News-এও কথিত উদ্ধৃতিটি প্রচারিত হয়। পরে অবশ্য সেই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওয়াল্টজ তাঁর পোস্টটি X থেকে সরিয়ে দেন, যদিও কোনও ব্যাখ্যা দেননি। Fox News-ও পরে জানায়, উদ্ধৃতিটি যাচাই করা হয়নি এবং তা সঠিক নয়।
ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই ভাইরাল দাবিকে ‘মিথ্যার বন্যা’র অংশ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ইরানকে ঘিরে এমন দাবি বহু বছর ধরেই সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে জনমত তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে তাঁর পাল্টা অভিযোগের পক্ষেও স্বাধীন প্রমাণ সামনে আসেনি।
এই ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধের সময়ে একটি অজ্ঞাত সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট কীভাবে বিভিন্ন দেশ, ভাষা ও সংবাদমাধ্যম পেরিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ হয়ে উঠতে পারে। তথ্য যাচাই হওয়ার আগেই যখন কোনও দাবি বারবার বিভিন্ন জায়গায় প্রচারিত হয়, তখন সেটিই ধীরে ধীরে সত্য বলে মনে হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। ইরান-আমেরিকা সংঘাতের মধ্যে তাই সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি তথ্যযুদ্ধও এখন গুরুত্বপূর্ণ সমরক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।