বিশ্বকাপের মঞ্চে অঘটনের ইতিহাস নতুন নয়। তবে কিছু কিছু গল্প থাকে, যা শুধুমাত্র ফলাফলের জন্য নয়, মানুষের লড়াই ও স্বপ্নপূরণের জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকে। আটলান্টার রাতে তেমনই এক রূপকথার জন্ম দিল কেপ ভার্দে। ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের নজর কেড়ে নিল আফ্রিকার ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রটি। আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে একটাই নাম— ভোজিনহা।

ম্যাচের পর স্প্যানিশ তারকা পেদ্রি, রদ্রি কিংবা লামিন ইয়ামালের চেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে ভোজিনহার নাম। কারণ, স্পেনের একের পর এক আক্রমণ, হেড, ভলি এবং দূরপাল্লার শটের সামনে যেন অদম্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে স্পেনের নিশ্চিত গোল ফিরিয়ে দেন কেপ ভার্দের এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। একটা সময় ম্যাচটা যেন পরিণত হয়েছিল ‘স্পেন বনাম ভোজিনহা’-তে।
কিন্তু কে এই ভোজিনহা?
তাঁর আসল নাম জোসিমার জোসে ইভোরা দিয়াজ। ১৯৮৬ সালে কেপ ভার্দেতে জন্ম। বর্তমানে পর্তুগালের দ্বিতীয় ডিভিশনের ক্লাব চাভেসের হয়ে খেলেন। জাতীয় দলের জার্সিতে ৯০টিরও বেশি ম্যাচ খেলেছেন। অথচ বিশ্বকাপের মতো মহামঞ্চে অভিষেকের জন্য তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত।
ভোজিনহা নামটিও তাঁর আসল নাম নয়। ২০১২ সালে অ্যাঙ্গোলার ক্লাব প্রোগ্রেসোতে যোগ দেওয়ার পর দেখা যায়, সেখানে আগে থেকেই একজন গোলকিপারের নাম জোসিমার। বিভ্রান্তি এড়াতে ব্যবহার করতে হয় শৈশবের ডাকনাম ‘ভোজিনহা’। পর্তুগিজ ভাষায় যার অর্থ ‘গলার স্বর’ বা ‘কণ্ঠস্বর’। নামটি দিয়েছিলেন তাঁর দাদু-ঠাকুমা, যাঁদের হাতেই তাঁর বড় হয়ে ওঠা।
শৈশবটা সহজ ছিল না। বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীতে, মা কাজের সূত্রে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকতেন। ফলে দাদু-ঠাকুমাই ছিলেন তাঁর আশ্রয়। তাঁদের দেওয়া সেই ডাকনামই একদিন বিশ্ব ফুটবলের শিরোনামে জায়গা করে নেবে, হয়তো তখন কেউ ভাবেননি।
{{/usCountry}}শৈশবটা সহজ ছিল না। বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীতে, মা কাজের সূত্রে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকতেন। ফলে দাদু-ঠাকুমাই ছিলেন তাঁর আশ্রয়। তাঁদের দেওয়া সেই ডাকনামই একদিন বিশ্ব ফুটবলের শিরোনামে জায়গা করে নেবে, হয়তো তখন কেউ ভাবেননি।
{{/usCountry}}স্পেনের বিরুদ্ধে ম্যাচে কেপ ভার্দে মাত্র একটি শট নিতে পেরেছিল। অন্যদিকে স্পেন গোটা ম্যাচ জুড়ে একের পর এক আক্রমণ চালিয়েছে। কিন্তু ভোজিনহার দৃঢ়তা, অভিজ্ঞতা এবং অসাধারণ প্রতিক্রিয়ার সামনে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন ফেরান তোরেস, মিকেল ওয়ারজাবাল, মার্কাস লরেন্তে কিংবা লাপোর্তেরা। শেষ বাঁশি বাজার পর স্টেডিয়াম জুড়ে ধ্বনিত হয় তাঁর নাম। আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ভোজিনহা। চোখ ভিজে ওঠে আনন্দাশ্রুতে।
বিশ্বকাপে অনেক নায়ক জন্ম নেয়। কেউ গোল করে, কেউ ট্রফি জেতে। কিন্তু কিছু নায়ক ইতিহাসে জায়গা করে নেয় অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য। ভোজিনহা সেই তালিকাতেই নাম লিখিয়ে ফেললেন। পাঁচ লক্ষের একটি দেশের স্বপ্নকে নিজের দুই হাতে আগলে রেখে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, ফুটবলে সবসময় অর্থ, পরিকাঠামো কিংবা তারকারাই শেষ কথা নয়। কখনও কখনও একটি বড় হৃদয়, অদম্য লড়াই আর বিশ্বাসই লিখে দেয় সবচেয়ে সুন্দর গল্প। স্পেনের কাছে এটি হয়তো হারানো দুই পয়েন্ট। কিন্তু কেপ ভার্দের কাছে এটি এক ঐতিহাসিক জয়। আর সেই জয়ের মুখ হয়ে চিরকাল মনে রাখা হবে ভোজিনহাকে।