মাঠে আর্জেন্টিনা খেললেই আজও টিভির সামনে বসে পড়েন ৮০ বছরের হেম কুমার শ্রেষ্ঠ। লিওনেল মেসির প্রতিটি পাস, প্রতিটি গোলেই উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন তিনি। কিন্তু এই মানুষটিই একসময় বন্দুক হাতে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড বা মালভিনাস যুদ্ধে ব্রিটিশ গোর্খা রেজিমেন্টের সদস্য হিসেবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। যুদ্ধের ৪৫ বছর পর সেই প্রাক্তন ‘শত্রু’ দেশের ফুটবল দলের সবচেয়ে বড় সমর্থকদের একজন হয়ে উঠেছেন হেম কুমার। তাঁর এই জীবনের গল্প এখন নতুন করে আলোচনায়।

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর এস্টেস পার্কে ‘নেপালস ক্যাফে’ নামে একটি রেস্তোরাঁ চালান হেম কুমার শ্রেষ্ঠ। বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ম্যাচ দেখার পর তিনি বলেন, 'অবশ্যই আমি আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করি। যুদ্ধে আমরা জিতেছিলাম, আর্জেন্টিনা হেরেছিল। তারা হয়ত নেপালকে পছন্দ না-ও করতে পারে, কারণ আমরা ব্রিটেনের পক্ষে লড়েছিলাম। কিন্তু নেপালিদের মনে কোনও বিদ্বেষ নেই। আমরা মেসি আর আর্জেন্টিনাকে ভালোবাসি।'
হেম কুমারের জন্ম নেপালের পূর্বাঞ্চলের খান্ডবারির কাছে এক কৃষক পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই ব্রিটিশ গোর্খা সেনাদের দেখে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। সে সময় নিউয়ার সম্প্রদায়ের মানুষদের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে নেওয়া হত না। তাই নিজের নাম বদলে ‘হেম কুমার গুরুং’ রেখে তিনি গুর্খা রেজিমেন্টে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে ‘সেভেন্থ ডিউক অব এডিনবার্গস ওন গোর্খা রাইফেলস’-এ যোগ দিয়ে হংকং, ব্রুনেই, ফিজি হয়ে শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে কর্মরত ছিলেন।
১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল আর্জেন্টিনা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দখল করলে শুরু হয় ব্রিটেন-আর্জেন্টিনা যুদ্ধ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের নির্দেশে সামরিক বাহিনী দক্ষিণ আটলান্টিকে পাঠানো হয়। সেই অভিযানে ছিলেন হেম কুমারও। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে তাঁরা কাদা, তীব্র ঠান্ডা, ক্ষুধা এবং লাগাতার গোলাবর্ষণের মধ্যে লড়াই চালান। তিনি স্মরণ করেন, খাবারের অভাবে ইউনিফর্মের পকেটে লুকিয়ে রাখা এক কেজি চালই কয়েকদিনের ভরসা ছিল।
যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতিও আজও তাড়া করে তাঁকে। গুরুতর আহত এক সহযোদ্ধার অন্ত্র বাইরে বেরিয়ে আসার পর তাঁকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহ, তুষারপাতের মধ্যে যুদ্ধ—সবকিছুই এখনও স্পষ্ট মনে রয়েছে তাঁর। তিনি জানান, গুর্খাদের খুকরির ভয়ে অনেক আর্জেন্টাইন সেনা গুলি না চলেই আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ব্রিটিশ বাহিনীও সেই ভয়কে মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
{{/usCountry}}যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতিও আজও তাড়া করে তাঁকে। গুরুতর আহত এক সহযোদ্ধার অন্ত্র বাইরে বেরিয়ে আসার পর তাঁকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা, চারপাশে ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহ, তুষারপাতের মধ্যে যুদ্ধ—সবকিছুই এখনও স্পষ্ট মনে রয়েছে তাঁর। তিনি জানান, গুর্খাদের খুকরির ভয়ে অনেক আর্জেন্টাইন সেনা গুলি না চলেই আত্মসমর্পণ করেছিলেন। ব্রিটিশ বাহিনীও সেই ভয়কে মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল।
{{/usCountry}}১৯৮২ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনা আত্মসমর্পণ করলে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। প্রায় ৬০০ গুর্খা সেনার মধ্যে মাত্র একজন নিহত হয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষে হেম কুমার ইংল্যান্ডে ফিরে যান। পরে অবসর নিয়ে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং নিজের রেস্তোরাঁ খোলেন। আজ হেম কুমারের বয়স ৮০। তা হলেও বিশ্বকাপ এলেই তাঁর উন্মাদনা একটুও কমে না। ফকল্যান্ড যুদ্ধে যাদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন, আজ সেই দেশের ফুটবল দলকেই প্রাণভরে সমর্থন করেন তিনি। তাঁর কথায়, 'আমি গ্যালারিতে বসে মেসি আর আর্জেন্টিনার জন্যই চিৎকার করতে চাই।'