Ice Cream History India: গ্রীষ্মের দাবদাহে এক টুকরো আইসক্রিম বা কুলফি যেন অমৃতের সমান। কিন্তু আপনি কি জানেন, ফ্রিজ বা রেফ্রিজারেটর আসার অনেক আগে থেকেই ভারতে বরফ মেশানো এই ঠান্ডা মিষ্টান্ন খাওয়ার প্রচলন ছিল? মুঘল দরবার থেকে ব্রিটিশ রাজ—ভারতে আইসক্রিমের বিবর্তনের ইতিহাস অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা জানব ভারতে আইসক্রিম আসার সেই অজানা কথা।

বর্তমানে আমরা যে আধুনিক আইসক্রিম খাই, তা ভারতে আসার আগে এখানে দাপট ছিল ‘কুলফি’-র। অনেকের ধারণা আইসক্রিম একটি পশ্চিমা আবিষ্কার, কিন্তু এর আদি রূপ অর্থাৎ হিমায়িত মিষ্টান্ন বা ফ্রোজেন ডেজার্টের সাথে ভারতের সম্পর্ক কয়েক শতাব্দী প্রাচীন।
মুঘল আমল ও কুলফির জন্ম
ভারতে হিমায়িত মিষ্টান্নের ইতিহাস শুরু হয় মূলত ১৬শ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাটদের হাত ধরে। মুঘল সম্রাটরা পারস্য বা ইরান থেকে হিমায়িত খাবার তৈরির ধারণা নিয়ে এসেছিলেন। আইন-ই-আকবরি অনুযায়ী, সম্রাট আকবর হিমালয় থেকে বরফ আনিয়ে তা দিয়ে পানীয় এবং খাবার ঠান্ডা রাখতেন। এই সময় থেকেই দুধের সাথে মালাই, পেস্তা এবং জাফরান মিশিয়ে ধাতব নলে ভরে হিমায়িত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়, যা আমরা আজ ‘কুলফি’ নামে চিনি।
বরফ আনার রোমাঞ্চকর যুদ্ধ
ফ্রিজ আবিষ্কারের আগে ভারতে আইসক্রিম বা কুলফি বানানো ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল কাজ। তখন হিমালয় থেকে নদীপথে বা গরুর গাড়িতে করে বিশাল বরফের চাঁই দিল্লিতে আনা হতো। সেই বরফ যাতে গলে না যায়, তার জন্য খড় এবং লবণের প্রলেপ ব্যবহার করা হতো। পরে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস থেকে ফ্রেডরিক টিউডর (যাকে 'আইস কিং' বলা হয়) জাহাজ বোঝাই করে বিশাল বিশাল বরফের চাঁই কলকাতায় পাঠাতে শুরু করেন। ১৮৩৩ সালে কলকাতার বন্দরে প্রথম আমেরিকার বরফ পৌঁছালে শহর জুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল।
ব্রিটিশ রাজ ও আধুনিক আইসক্রিমের প্রবেশ
আধুনিক আইসক্রিম (যা মূলত ক্রিম, ডিম এবং চিনি দিয়ে তৈরি) ভারতে জনপ্রিয় হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। ব্রিটিশ রাজপুরুষ ও মেমসাহেবদের পার্টিতে আইসক্রিম ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। ১৮শ ও ১৯শ শতাব্দীতে কলকাতা, মুম্বাই এবং মাদ্রাজের মতো বড় শহরগুলোতে ব্রিটিশরা আইসক্রিম তৈরির জন্য আলাদা ‘আইস হাউস’ তৈরি করেছিল। প্রথম দিকে এটি কেবল অভিজাতদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা সাধারণ মানুষের নাগালে আসতে শুরু করে।
ভারতে বাণিজ্যিক আইসক্রিমের উত্থান
{{/usCountry}}আধুনিক আইসক্রিম (যা মূলত ক্রিম, ডিম এবং চিনি দিয়ে তৈরি) ভারতে জনপ্রিয় হয় ব্রিটিশ শাসনামলে। ব্রিটিশ রাজপুরুষ ও মেমসাহেবদের পার্টিতে আইসক্রিম ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। ১৮শ ও ১৯শ শতাব্দীতে কলকাতা, মুম্বাই এবং মাদ্রাজের মতো বড় শহরগুলোতে ব্রিটিশরা আইসক্রিম তৈরির জন্য আলাদা ‘আইস হাউস’ তৈরি করেছিল। প্রথম দিকে এটি কেবল অভিজাতদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা সাধারণ মানুষের নাগালে আসতে শুরু করে।
ভারতে বাণিজ্যিক আইসক্রিমের উত্থান
{{/usCountry}}ভারতে বাণিজ্যিকভাবে আইসক্রিম উৎপাদনের বিপ্লব ঘটে বিংশ শতাব্দীতে।
- কোয়ালিটি (Kwality): ১৯৪০ সালে এডওয়ার্ড লরেন্স ভ্যান ডের বোর্ট এবং পরমজিৎ সিং নেগি দিল্লিতে ‘কোয়ালিটি’ আইসক্রিম পার্লার শুরু করেন। এটিই ছিল ভারতে আধুনিক আইসক্রিম পার্লারের অগ্রদূত।
- ভাদিলাল (Vadilal): ১৯০৭ সালে ভাদিলাল গান্ধী আমেদাবাদে সোডা বাটার শুরু করেন এবং পরে হস্তচালিত যন্ত্রের মাধ্যমে আইসক্রিম বানানো শুরু করেন।
- আমুল (Amul): ভারতের দুগ্ধ বিপ্লবের পর আমুল যখন আইসক্রিম বাজারে নিয়ে আসে, তখন তা সাধারণ ভারতীয়দের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।
আজকের দিনে স্ট্রবেরি, চকোলেট বা মাচা ফ্লেভারের আইসক্রিম আমাদের হাতের কাছে থাকলেও, এর পেছনের ইতিহাসটি ছিল ঘাম এবং বরফের লড়াইয়ের। মুঘলদের সেই রাজকীয় কুলফি আজও আধুনিক আইসক্রিমের সাথে পাল্লা দিয়ে তার জায়গা ধরে রেখেছে। কলকাতা থেকে কন্যাকুমারী—আইসক্রিম আজ আর কেবল বিলাসের বস্তু নয়, বরং এটি ভারতীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য মিষ্টি আমেজ।