Napoleon death mystery Scheeles Green arsenic: ফ্রান্সের মহাপরাক্রমশালী সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (Napoleon Bonaparte)-এর নাম শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। গোটা ইউরোপ কাঁপানো এই বীর সেনানায়কের জীবন যেমন রোমাঞ্চে ভরা ছিল, তেমনই তাঁর মৃত্যু ঘিরে আজও রয়ে গেছে এক পরম রহস্য। ১৮২১ সালের ৫ মে আটলান্টিক মহাসাগরের এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সেন্ট হেলেনাতে (St. Helena) মাত্র ৫১ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নেপোলিয়ন। দীর্ঘকাল ধরে ধারণা করা হতো যে, পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।

তবে বিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিজ্ঞান ও রসায়নবিদেরা নেপোলিয়নের চুল পরীক্ষা করে এক চাঞ্চল্যকর ও অবিশ্বাস্য তথ্য সামনে নিয়ে আসেন। আর সেই তথ্য ইঙ্গিত করে— নেপোলিয়নের রহস্যময় মৃত্যুর পেছনে কোনো সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বিষপ্রয়োগ বা গুপ্তঘাতক ছিল না, বরং তাঁর মৃত্যুর কারণ লুকিয়ে ছিল তিনি যে দুর্গে বন্দি ছিলেন, তার ঘরের দেয়ালের সবুজ রঙের মধ্যে!
১৮১৫ সালে ওয়াটারলুর যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয়ের পর ব্রিটিশরা নেপোলিয়নকে দক্ষিণ আটলান্টিকের নির্জন ‘সেন্ট হেলেনা’ দ্বীপে নির্বাসনে পাঠায়। সেখানে ‘লংউড হাউস’ (Longwood House) নামক এক আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে দুর্গে তাঁকে বন্দি রাখা হয়েছিল। নির্বাসনের শেষ দিনগুলোতে সম্রাট চরম শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন— পেটে তীব্র ব্যথা, বমি, অতিরিক্ত তৃষ্ণা এবং ক্রমাগত শারীরিক দুর্বলতা তাঁকে গ্রাস করেছিল।
শীতল পরিবেশ ও কেমিক্যালের ছোঁয়া: রঙে লুকিয়ে থাকা কালান্তক বিষ
ভিক্টোরীয় যুগে (Victorian Era) ইউরোপে ঘরের দেয়াল সাজাতে এক বিশেষ ধরণের উজ্জ্বল সবুজ রঙের প্রচলন মারাত্মক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এই সবুজ রঞ্জক পদার্থটির নাম ছিল ‘শেলেস গ্রিন’ (Scheele's Green), যা ১৭৭৫ সালে সুইডিশ রসায়নবিদ কার্ল উইলহেম শেলে আবিষ্কার করেছিলেন। এই অপূর্ব নটি-গ্রিন বা বাসন্তী সবুজ রং তৈরি করতে ব্যবহৃত হতো কেমিক্যাল কপার আর্সেনাইট (Copper Arsenite)।
নেপোলিয়ন যে লংউড হাউসে বন্দি ছিলেন, তাঁর শোবার ঘর ও বসার ঘরের দেয়ালগুলো এই মনকাড়া উজ্জ্বল সবুজ রঙের ওয়ালপেপার দিয়ে সাজানো হয়েছিল। সম্রাট সবুজ রং অত্যন্ত পছন্দ করতেন, ফলে তাঁর চারপাশের পুরো পরিবেশটাই ঢেকে গিয়েছিল এই কেমিক্যালে।
কীভাবে দেওয়াল থেকে ফুসফুসে প্রবেশ করেছিল বিষ?
{{/usCountry}}নেপোলিয়ন যে লংউড হাউসে বন্দি ছিলেন, তাঁর শোবার ঘর ও বসার ঘরের দেয়ালগুলো এই মনকাড়া উজ্জ্বল সবুজ রঙের ওয়ালপেপার দিয়ে সাজানো হয়েছিল। সম্রাট সবুজ রং অত্যন্ত পছন্দ করতেন, ফলে তাঁর চারপাশের পুরো পরিবেশটাই ঢেকে গিয়েছিল এই কেমিক্যালে।
কীভাবে দেওয়াল থেকে ফুসফুসে প্রবেশ করেছিল বিষ?
{{/usCountry}}সেন্ট হেলেনা দ্বীপের জলবায়ু ছিল অত্যন্ত আর্দ্র ও স্যাঁতসেঁতে। লংউড হাউসের দেওয়ালের ওয়ালপেপারগুলোতে আর্দ্রতার কারণে সহজে ছত্রাক বা মোল্ড (Fungus/Mold) জন্ম নিত।
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে আসে যে, ঘরের দেয়ালে জমা এই ছত্রাকগুলো ওয়ালপেপারের কপার আর্সেনাইটের সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটাত। এই বিক্রিয়ার ফলে তৈরি হতো ‘ট্রিমিথাইলআর্সিন’ (Trimethylarsine) নামক এক বিষাক্ত, গন্ধহীন আর্সেনিক গ্যাস। নেপোলিয়ন যখন বদ্ধ ঘরে ঘুমাতেন বা বিশ্রাম নিতেন, তখন এই অদৃশ্য বিষাক্ত আর্সেনিক গ্যাস বাতাসের সাথে ধীরে ধীরে নিঃশ্বাসের মাধ্যমে তাঁর ফুসফুসে ও শরীরে প্রবেশ করত।
বিজ্ঞানীদের চুল পরীক্ষা ও চাঞ্চল্যকর প্রমাণ
১৯৬০-এর দশকে গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিষবিজ্ঞানী ডক্টর হ্যামিল্টন স্মিথ এবং তাঁর দল আধুনিক ‘নিউট্রন অ্যাক্টিভেশন অ্যানালিসিস’ প্রযুক্তির সাহায্যে নেপোলিয়নের মৃত্যুর পর সংরক্ষিত চুলের নমুনায় পরীক্ষা চালান।
পরীক্ষার ফলাফল দেখে বিজ্ঞানীরা রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে যান! নেপোলিয়নের চুলে সাধারণ মানুষের শরীরে থাকা আর্সেনিকের তুলনায় প্রায় ১৩ থেকে ৩৮ গুণ বেশি আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। চুলে পাওয়া আর্সেনিকের এই পরিমাণের ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত নেন যে, কোনো একদিনে হঠাৎ তীব্র বিষ দিয়ে নয়, বরং দীর্ঘ ৫ বছর ধরে সেন্ট হেলেনার আর্দ্র দুর্গের সবুজ দেওয়াল থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস নিঃশ্বাসে গ্রহণ করার ফলেই সম্রাটের শরীর ধীরে ধীরে বিষাক্ত (Slow Arsenic Poisoning) হয়ে পড়েছিল।
যদিও আধুনিক ঐতিহাসিকদের একাংশ আজও মনে করেন যে ক্যানসারই নেপোলিয়নের মূল রোগ ছিল, তবে দেওয়ালের বিষাক্ত সবুজ রঙের ভূমিকা নেপোলিয়নের শারীরিক অবস্থাকে দ্রুত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল— তা বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত। একটি সাম্রাজ্য জয় করা মহাবীর যে শেষ পর্যন্ত ঘরের দেয়ালের এক ফোটা রঙের অদৃশ্য বিষে এভাবে প্রাণ হারাবেন, তা ইতিহাস ও বিজ্ঞানের এক পরম আইরনি!