আমেরিকা ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বাধলে ভারতের পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ানো উচিত! রাজস্থানের বিজেপি সভাপতি মদন রাঠোরের এমন মন্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে জাতীয় রাজনীতিতে। তাঁর বক্তব্যের একটি ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসতেই সরব হয়েছে কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টি (আপ)। বিজেপির জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। যদিও বিতর্কের মুখে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন মদন। তাঁর দাবি, বক্তব্যের শেষের কয়েকটি লাইন তুলে ধরে তা বিকৃত করে প্রচার করা হচ্ছে। আসলে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের প্রসঙ্গে কথাগুলি বলেছিলেন তিনি।

ঘটনার সূত্রপাত জয়পুরে একটি অনুষ্ঠানে। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজস্থান বিজেপির সভাপতি বলেন, “আমাদের বিষয়টি বুঝতে হবে। আজ যদি আমেরিকা ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়, তা হলে আমরা পাকিস্তানের পাশে দাঁড়াব। কারণ, তারা আমাদের প্রতিবেশী দেশ। কিন্তু নিজেদের মধ্যে কোনও সমস্যা হলে আমরা ভারতের পাশে দাঁড়াব।” তাঁর এই মন্তব্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় চাপানউতর। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সংঘাত এবং সীমান্তে জঙ্গি কার্যকলাপের প্রেক্ষাপটে বিজেপি নেতার এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা।
মদনের মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন কংগ্রেসের মুখপাত্র শামা মহম্মদ। সমাজমাধ্যমে তিনি অভিযোগ করেন, যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনা ও সাধারণ মানুষের উপর হামলার অভিযোগ রয়েছে, সেই দেশের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলে বিজেপি নেতা দলের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তাঁকে দেশবিরোধী বলেও আক্রমণ করেছেন শামা। পাশাপাশি, এই মন্তব্যের জন্য মদনের বিরুদ্ধে বিজেপি নেতৃত্ব কী পদক্ষেপ করবে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অবস্থান কী, তা নিয়েও জবাব চেয়েছে কংগ্রেস।
মদনের মন্তব্যের ভিডিয়ো ভাগ করে নিয়ে বিজেপিকে আক্রমণ করেছে অরবিন্দ কেজরীওয়ালের দল আপ-ও। তাদের প্রশ্ন, সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুললে বা তরুণেরা প্রতিবাদ করলে তাঁদের দেশবিরোধী তকমা দেওয়া হয়। অথচ বিজেপির কোনও নেতা পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ানোর কথা বললে দলের জাতীয়তাবাদ কোথায় চলে যায়? প্রধানমন্ত্রী মোদীর কাছেও জবাব চেয়েছে আপ। দলের বক্তব্য, বিজেপি নেতার এই মন্তব্যের দায় এড়িয়ে যেতে পারে না দলীয় নেতৃত্ব।
{{/usCountry}}মদনের মন্তব্যের ভিডিয়ো ভাগ করে নিয়ে বিজেপিকে আক্রমণ করেছে অরবিন্দ কেজরীওয়ালের দল আপ-ও। তাদের প্রশ্ন, সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুললে বা তরুণেরা প্রতিবাদ করলে তাঁদের দেশবিরোধী তকমা দেওয়া হয়। অথচ বিজেপির কোনও নেতা পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ানোর কথা বললে দলের জাতীয়তাবাদ কোথায় চলে যায়? প্রধানমন্ত্রী মোদীর কাছেও জবাব চেয়েছে আপ। দলের বক্তব্য, বিজেপি নেতার এই মন্তব্যের দায় এড়িয়ে যেতে পারে না দলীয় নেতৃত্ব।
{{/usCountry}}বিতর্ক বাড়তেই নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন মদন রাঠোর। তাঁর দাবি, বক্তব্যের কিছু অংশ আলাদা করে তুলে ধরে ভুল অর্থে প্রচার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচের প্রসঙ্গেই কথাগুলি বলেছিলেন। তাঁর যুক্তি, কোনও ম্যাচে ভারত হারলে কেউ যদি পাকিস্তানের জয়ে বাজি ফাটিয়ে উৎসব করেন, তা হলে তাঁকে দেশপ্রেমিক বলা যায় না। একই সঙ্গে আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রসঙ্গও তুলেছিলেন তিনি বলে দাবি করেছেন।
মদনের কথায়, তাঁর বক্তব্যের শেষের কয়েকটি লাইন তুলে ধরে এমন ভাবে প্রচার করা হয়েছে, যাতে মানুষের কাছে ভুল বার্তা যায়। এর পিছনে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার রয়েছে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে বিজেপি সভাপতির এই ব্যাখ্যার পরেও বিতর্ক থামেনি। তাঁর বক্তব্যের যে অংশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক তরজা অব্যাহত। এখন দেখার, এই বিতর্কে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব কোনও প্রতিক্রিয়া দেয় কি না। আপাতত মদনের মন্তব্য ও তার ব্যাখ্যাকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন চাপানউতর।
একদা ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ ট্রাম্প, এখন আমেরিকার প্রতি এত ক্ষোভ কেন?
এদিকে একসময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ বলেই তুলে ধরতেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দুই রাষ্ট্রনেতার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের অন্যতম আলোচিত দিক। আমেরিকায় ‘হাউডি মোদী’ থেকে ভারতে ‘নমস্তে ট্রাম্প’, দুই দেশের নেতার একসঙ্গে মঞ্চে ওঠা বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই সম্পর্কে এখন জমেছে অবিশ্বাস। বাণিজ্য নিয়ে চাপ, পাকিস্তান প্রসঙ্গে ওয়াশিংটনের ভূমিকা এবং ভারতের উপর শুল্কের বোঝা—সব মিলিয়ে আমেরিকার প্রতি ক্ষোভের সুর ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। সম্প্রতি রাজস্থান বিজেপির সভাপতি মদন রাঠোরের মন্তব্য সেই বৃহত্তর টানাপোড়েনের দিকেই নজর টেনেছে।
পাকিস্তান প্রশ্নেই সবচেয়ে বড় ফাটল
ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে দূরত্ব তৈরির অন্যতম কারণ পাকিস্তান। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তাঁর মধ্যস্থতায় দুই দেশ সংঘর্ষবিরতিতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু নয়াদিল্লি সেই দাবি মানেনি। ভারতের বক্তব্য ছিল, দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমেই সংঘর্ষবিরতি হয়েছিল। কোনও তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতা ছিল না।
এই বিষয়টি ভারতের কাছে শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের প্রশ্ন নয়। দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে এসেছে নয়াদিল্লি। সেই পরিস্থিতিতে আমেরিকার সঙ্গে পাকিস্তানের যোগাযোগ এবং ইসলামাবাদকে ঘিরে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক তৎপরতা ভারতের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।
সেপ্টেম্বরের শেষেও বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর আমেরিকার বিরুদ্ধে ভারতের সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রতি যথেষ্ট সহমর্মিতা না দেখানোর অভিযোগ তুলেছিলেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, পাকিস্তান নিয়ে ভারতের নিরাপত্তার উদ্বেগ দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে উঠেছে।
বন্ধুত্বের বদলে শুল্কের চাপ
দ্বিতীয় বড় কারণ বাণিজ্য। ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক বাড়িয়ে একসময় মোট ৫০ শতাংশ পর্যন্ত চাপ তৈরি করেছিল। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার বিষয়টিও এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত বাণিজ্য কাঠামোয় শুল্ক ১৮ শতাংশে নামানোর কথা জানায় ওয়াশিংটন। তবে চুক্তির চূড়ান্ত রূপ নিয়ে আলোচনা এখনও চলছে। রাশিয়ার তেল কেনা ঘিরে নতুন করে আরও কঠোর শুল্কের আশঙ্কাও রয়েছে।
ভারতের কাছে প্রশ্ন উঠেছে, যে দেশকে কৌশলগত বন্ধু বলে প্রচার করা হয়েছে, সেই দেশই কেন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এতটা চাপ তৈরি করবে? আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি যদি পারস্পরিক স্বার্থ হয়, তা হলে ভারতের উপর একতরফা শর্ত চাপানোর চেষ্টা কেন—এই প্রশ্নও উঠছে।
ভারতীয়দের স্বপ্নেও ধাক্কা
আমেরিকার কড়া অভিবাসন নীতিও ক্ষোভের আরেকটি কারণ। ২০২৫ সালে নতুন এইচ-১বি ভিসার আবেদনের ক্ষেত্রে এক লক্ষ ডলার পর্যন্ত ফি ধার্য করার ঘোষণা করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। আমেরিকায় কাজ করতে আগ্রহী ভারতীয় প্রযুক্তিকর্মী এবং তাঁদের নিয়োগকারী সংস্থাগুলির কাছে এই পদক্ষেপ বড় উদ্বেগ তৈরি করে।