ফের মুখোমুখি ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি জিনপিং। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন চিনের প্রেসিডেন্ট। তিন দিনের সফরে আমেরিকায় এসেছেন শি। বিশ্বের দুই পরাশক্তির এই বৈঠক ঘিরে তাই নজর গোটা বিশ্বের। আলোচনার টেবিলে থাকছে বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, তাইওয়ান এবং ইরান। এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, গত বছর বুসানে তৈরি হওয়া মার্কিন-চিন বাণিজ্য-সমঝোতা কত দূর টিকবে। ইতিমধ্যেই দুই দেশ সেই সমঝোতার মেয়াদ আরও দু’মাস বাড়িয়েছে।
এক বছর আগের পরিস্থিতির সঙ্গে আজকের ছবির বিস্তর ফারাক। ২০২৫ সালে বাণিজ্যযুদ্ধে দুই দেশের সম্পর্ক কার্যত তলানিতে ঠেকেছিল। চিনা পণ্যের উপর বিপুল শুল্ক চাপিয়েছিল ওয়াশিংটন। পাল্টা পদক্ষেপ হিসাবে চিন বিরল খনিজ রফতানির উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় এবং আমেরিকা থেকে আসা পণ্যের উপরও শুল্ক বাড়ানো হয়েছিল। পরে আলোচনা শুরু হয়। গত বছরের বুসান বৈঠকের পর সাময়িক ভাবে উত্তেজনা কমে। আমেরিকা শুল্কের চাপ কিছুটা কমায়, আর চিন বিরল খনিজ রফতানিতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার এবং বেশি পরিমাণে মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার কথা জানায়।
এ বার সেই আপসের মেয়াদ আরও বাড়ানো হলেও, মূল দ্বন্দ্ব কিন্তু মেটেনি। দুই দেশই এখনও একে অপরকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবেই দেখছে। প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপড়েনও চলছে। ফলে শি-ট্রাম্প বৈঠকের বাইরে উষ্ণ অভ্যর্থনা থাকলেও, ভিতরে আলোচনায় যে কঠিন দর-কষাকষি হবে, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
সবচেয়ে নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি এআই। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, চিনা সংস্থাগুলি মার্কিন এআই মডেলের প্রযুক্তিগত ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেদের সিস্টেম তৈরি করছে। অন্য দিকে, বেজিং মনে করে, আমেরিকা উন্নত প্রযুক্তিতে চিনের প্রবেশ আটকাতে নিয়ম-কানুন কড়া করছে। বৈঠকের আগে দুই দেশের আধিকারিকেরা এআই নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা আলোচনা করেছেন। আমেরিকার তরফে বড় ধরনের এআই-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা হলে তা দ্রুত একে অপরকে জানানোর মতো একটি ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে। তবে এই খাতে কতটা বাস্তব সমঝোতা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
{{/usCountry}}সবচেয়ে নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি এআই। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, চিনা সংস্থাগুলি মার্কিন এআই মডেলের প্রযুক্তিগত ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেদের সিস্টেম তৈরি করছে। অন্য দিকে, বেজিং মনে করে, আমেরিকা উন্নত প্রযুক্তিতে চিনের প্রবেশ আটকাতে নিয়ম-কানুন কড়া করছে। বৈঠকের আগে দুই দেশের আধিকারিকেরা এআই নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা আলোচনা করেছেন। আমেরিকার তরফে বড় ধরনের এআই-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা হলে তা দ্রুত একে অপরকে জানানোর মতো একটি ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাবও রয়েছে। তবে এই খাতে কতটা বাস্তব সমঝোতা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
{{/usCountry}}আলোচনায় থাকবে তাইওয়ানও। তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চিন। আমেরিকার সঙ্গে তার নিরাপত্তা সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই বেজিংয়ের আপত্তি। সাম্প্রতিক কালে তাইওয়ানের জন্য সম্ভাব্য ১৪০০ কোটি ডলারের মার্কিন অস্ত্রচুক্তিও এই বৈঠককে আরও স্পর্শকাতর করেছে। ফলে শি এই প্রসঙ্গে ট্রাম্পের অবস্থান কী, তা জানার চেষ্টা করবেন বলেই মনে করা হচ্ছে। ওয়াশিংটনেও একাংশ চাইছে, তাইওয়ান প্রশ্নে কোনও বড় ছাড় যেন না দেওয়া হয়।
এর সঙ্গে জুড়েছে ইরানের প্রসঙ্গ। পশ্চিম এশিয়ার চলতি যুদ্ধের পরিস্থিতিতে চিনের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আমেরিকার চাপ রয়েছে। ওয়াশিংটন চাইছে, বেজিং তেহরানের উপর প্রভাব খাটিয়ে সংঘাত কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা নিক। চিন অবশ্য ইরানের সঙ্গে তার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ফলে এই বিষয়েও দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে মতপার্থক্য থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট।
এই বৈঠকের দিকে তাই নজর নয়াদিল্লিরও। কারণ আমেরিকা-চিন সম্পর্কের ওঠানামার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যের উপর। ওয়াশিংটন যদি বেজিংয়ের সঙ্গে আরও স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, তা হলে এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত গুরুত্ব কতটা বদলাবে—সেটিও আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে ভারত-চিন সম্পর্কেও সীমান্ত-সহ একাধিক জটিলতা রয়েছে। ফলে আমেরিকা ও চিনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা যেমন নয়াদিল্লি নজরে রাখবে, তেমনই অতিরিক্ত সংঘাতও ভারতের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প-শি বৈঠকের আসল পরীক্ষা শুধু নতুন চুক্তি হবে কি না, তা নয়। বাণিজ্য-সমঝোতা কত দিন টেকে, প্রযুক্তি যুদ্ধ কতটা কমে, তাইওয়ান ও ইরানের মতো স্পর্শকাতর প্রশ্নে দুই পক্ষ কতটা সমঝোতার রাস্তা খুঁজে পায়—সেটাই এখন দেখার। এশিয়ার বহু দেশই চাইছে, আমেরিকা ও চিনের সম্পর্ক না হোক অতিরিক্ত সংঘাতপূর্ণ, আবার এমন ঘনিষ্ঠও না হোক যাতে অন্য দেশগুলির স্বার্থ তাদের মাথার উপর দিয়ে ঠিক হয়ে যায়।