রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী আসনের দাবিতে এবার কূটনীতির পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকেও হাতিয়ার করতে চাইছে ভারত। আগামী পাঁচ বছরে আরও ২০টি দেশে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে ডিফেন্স উইং বা প্রতিরক্ষা শাখা খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানে নিয়োগ করা হবে ডিফেন্স অ্যাটাশে এবং প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাদের। লক্ষ্য একদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও মজবুত করা, অন্য দিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের প্রতি সমর্থনের পরিধি বাড়ানো।
ইতিমধ্যেই ৫২ দেশে প্রতিরক্ষা শাখা

সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে ৫২টি দেশে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে ডিফেন্স উইং রয়েছে। এবার ধাপে ধাপে আরও ২০টি দেশকে এই নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে। আফ্রিকা, ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশকে এই তালিকায় রাখা হয়েছে।
কোনও দেশকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, প্রতিরক্ষা বাণিজ্যের সম্ভাবনাও গুরুত্ব পাচ্ছে। যেসব দেশ ভারতের তৈরি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনতে আগ্রহী, অথচ সেখানে এখনও ভারতীয় ডিফেন্স অ্যাটাশে নেই, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রথম ধাপে ১০ দেশে ডিফেন্স উইং
প্রথম পর্যায়ে পোল্যান্ড, আলজেরিয়া, ইথিওপিয়া এবং মোজাম্বিক-সহ ১০টি দেশে প্রতিরক্ষা শাখা খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে মরক্কো, মেক্সিকো, কম্বোডিয়া এবং রোয়ান্ডার মতো দেশকে এই তালিকায় রাখা হয়েছে।
এর ফলে ওই দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সামরিক যোগাযোগ আরও সরাসরি হবে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনাবেচা, যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ, সামরিক প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে।
শুধু অস্ত্র বিক্রি নয়, বড় লক্ষ্য কূটনীতি
দিল্লির এই পরিকল্পনার পিছনে শুধু প্রতিরক্ষা ব্যবসা বাড়ানোর চিন্তা নেই। প্রতিরক্ষা কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করে ভারত নিজের কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে চাইছে। বিভিন্ন দেশের সামরিক নেতৃত্ব এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হলে আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়বে।
{{/usCountry}}দিল্লির এই পরিকল্পনার পিছনে শুধু প্রতিরক্ষা ব্যবসা বাড়ানোর চিন্তা নেই। প্রতিরক্ষা কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করে ভারত নিজের কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে চাইছে। বিভিন্ন দেশের সামরিক নেতৃত্ব এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হলে আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়বে।
{{/usCountry}}আর এখানেই নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো সংস্কার এবং ভারতকে স্থায়ী সদস্য করার পক্ষে ইতিমধ্যেই একাধিক দেশ প্রকাশ্যে মত দিয়েছে। ফলে যত বেশি দেশের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক মজবুত হবে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে দিল্লির প্রভাবও তত বাড়তে পারে।
ব্রিকসের পর এবার প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে জোর
বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের সক্রিয়তা গত কয়েক বছরে অনেকটাই বেড়েছে। কোয়াড থেকে ব্রিকস, জি২০ থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক—একাধিক মঞ্চে ভারত নিজের অবস্থান জোরালো করছে। তার সঙ্গে এবার প্রতিরক্ষা কূটনীতির এই নতুন সম্প্রসারণ যোগ হতে চলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক শুধু অস্ত্র কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ থাকে না। যৌথ প্রশিক্ষণ, তথ্য বিনিময়, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন এবং সামরিক প্রযুক্তি সহযোগিতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি হয়। ফলে ২০টি নতুন দেশে ডিফেন্স উইং খোলার সিদ্ধান্ত ভারতের সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই অংশ।
চিন-পাকিস্তানকে ঘিরে বাড়ছে গুরুত্ব
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চিনের প্রভাব এবং পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতার আবহে আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায় ভারতের উপস্থিতি বাড়ানোর পরিকল্পনাও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য নতুন বাজার তৈরি হলে তা দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পকেও আরও শক্তিশালী করবে।
সব মিলিয়ে, আরও ২০টি দেশে ডিফেন্স উইং খোলার সিদ্ধান্তকে শুধু দূতাবাসে নতুন পদ তৈরির বিষয় হিসেবে দেখছে না দিল্লি। এর মাধ্যমে একদিকে ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানি ও সামরিক সহযোগিতা বাড়বে, অন্য দিকে বিশ্বজুড়ে কৌশলগত প্রভাবও আরও বিস্তৃত হবে। আর সেই শক্তিশালী আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কই আগামী দিনে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী আসনের দাবিকে আরও জোরালো করার অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে।