ভারত মহাসাগর ঘিরে কৌশলগত প্রতিযোগিতা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। এই অঞ্চলে চিনের নৌ-তৎপরতা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বেজিংয়ের প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধির মধ্যে নিজেদের প্রভাব অটুট রাখতে সক্রিয় ভারত। বিশেষ করে মালদ্বীপের সঙ্গে চিনের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির পরে ভারত মহাসাগরের অন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করা নয়াদিল্লির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ মরিশাস। আর সেই কারণেই নৌসেনাপ্রধান অ্যাডমিরাল কৃষ্ণ স্বামীনাথনের চার দিনের মরিশাস সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

১০ থেকে ১৩ অগস্ট পর্যন্ত মরিশাস সফরে থাকবেন ভারতীয় নৌসেনাপ্রধান। সফরের মূল লক্ষ্য দুই দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং নৌ-সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা। মরিশাস সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক স্বার্থের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি। ভারত মহাসাগরে দ্রুত বদলে যাওয়া ভূকৌশলগত পরিস্থিতির মধ্যেই এই সফর হচ্ছে।
ভারতের জন্য মরিশাস কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? ভৌগোলিক অবস্থানই তার অন্যতম বড় কারণ। ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত মরিশাস আফ্রিকার পূর্ব উপকূল, মাদাগাস্কার এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ জলপথে নজরদারি, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে মরিশাসের সঙ্গে সহযোগিতা ভারতের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, ভারত মহাসাগরে চিনের উপস্থিতিও ক্রমশ নজরে আসছে। বেজিং দীর্ঘদিন ধরেই ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, পরিকাঠামোগত এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। চিনা নৌবাহিনীর জাহাজ চলাচল, গবেষণা ও নজরদারি সংক্রান্ত তৎপরতা নিয়েও ভারত নিয়মিত সতর্ক রয়েছে। ফলে ভারত মহাসাগরকে নিজেদের প্রভাবক্ষেত্র হিসেবে ধরে রাখতে নয়াদিল্লির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
মালদ্বীপের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে চিনের সঙ্গে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কাছে অবস্থিত। ফলে সেখানে যে কোনও বড় শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি ভারতের নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক কৌশলের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এই পরিস্থিতিতে মরিশাসের মতো ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের ঘনিষ্ঠ অংশীদারকে আরও শক্তভাবে পাশে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
{{/usCountry}}মালদ্বীপের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে চিনের সঙ্গে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কাছে অবস্থিত। ফলে সেখানে যে কোনও বড় শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি ভারতের নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক কৌশলের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এই পরিস্থিতিতে মরিশাসের মতো ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের ঘনিষ্ঠ অংশীদারকে আরও শক্তভাবে পাশে রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
{{/usCountry}}ভারত ও মরিশাসের নৌ-সহযোগিতা অবশ্য নতুন নয়। দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, যৌথ সমুদ্র নজরদারি এবং অপারেশনাল সহযোগিতা রয়েছে। মরিশাসের Exclusive Economic Zone বা EEZ-এ নজরদারিতেও ভারতীয় নৌসেনার সহযোগিতা রয়েছে। পাশাপাশি হাইড্রোগ্রাফিক সমীক্ষা, বন্দর সফর এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করে।
ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তায় মরিশাসকে আরও সক্রিয় অংশীদার করে তোলার লক্ষ্যও এই সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। IONS, MILAN, International Fleet Review, Goa Maritime Conclave, IOS SAGAR এবং Exercise AIKEYME-এর মতো বিভিন্ন আঞ্চলিক উদ্যোগে মরিশাসের অংশগ্রহণ রয়েছে। এর ফলে শুধু দুই দেশের সম্পর্কই নয়, ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলির মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতার নেটওয়ার্কও শক্তিশালী হচ্ছে।
নয়াদিল্লির MAHASAGAR—‘Mutual and Holistic Advancement for Security and Growth Across Regions’—ভাবনার সঙ্গেও মরিশাসের সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতা সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভারতের লক্ষ্য হল ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে নিরাপত্তা ও উন্নয়নের অংশীদারিত্ব তৈরি করা এবং কোনও একক শক্তির প্রভাব যাতে গোটা অঞ্চলে অতিরিক্ত বেড়ে না যায়, তা নিশ্চিত করা।
তাই নৌসেনাপ্রধানের মরিশাস সফরকে শুধুমাত্র সৌজন্য সফর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। ভারত মহাসাগরে চিনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত উপস্থিতি এবং মালদ্বীপের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বেজিংয়ের প্রভাব বৃদ্ধির আবহে মরিশাসকে পাশে রাখা ভারতের বৃহত্তর সামুদ্রিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারত মহাসাগরে নিজের প্রভাব, নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে আগামী দিনে মরিশাসের সঙ্গে এই সম্পর্ক আরও গভীর করার দিকেই যে নয়াদিল্লি এগোবে, নৌসেনাপ্রধানের সফর সেই বার্তাই দিচ্ছে।