বিবর্তনীয় নৃবিজ্ঞানের জগতে 'হোমো হ্যাবিলিস' (Homo habilis) এক অতি পরিচিত নাম। একে বলা হয় মানব প্রজাতির আদিমতম সদস্য। কিন্তু বর্তমান সময়ের উন্নত প্রযুক্তি এবং নতুন নতুন জীবাশ্ম আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানীদের মনে এক বড় প্রশ্ন দানা বেঁধেছে—'হোমো হ্যাবিলিস' কি সত্যিই একজন মানুষ (Human), নাকি এটি আসলে বনমানুষ বা অস্ট্রালোপিথেকাসের একটি উন্নত সংস্করণ মাত্র?

লাইভ সায়েন্স (Live Science)-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণামূলক প্রতিবেদন বলছে, এই বিষয় নিয়ে বিতর্ক এবং রহস্য ফের জটিল হয়ে উঠেছে।
মানুষের বিবর্তনের ইতিহাস একটি বিশাল ধাঁধার মতো, যার প্রতিটি অংশ একে অপরের সাথে নিখুঁতভাবে মেলে না। এই ধাঁধার সবথেকে বড় এবং রহস্যময় অংশটির নাম হলো 'হোমো হ্যাবিলিস'। ল্যাটিন ভাষায় এর নামের অর্থ হলো 'দক্ষ মানুষ' বা 'Handy Man'। ১৯৬০-এর দশকে যখন তানজানিয়ার ওলডুভাই গর্জে (Olduvai Gorge) এর জীবাশ্ম প্রথম আবিষ্কৃত হয়, তখন বিজ্ঞানী লুই লিকি এবং তাঁর দল বিশ্বাস করেছিলেন যে তাঁরা মানুষের বংশলতিকার প্রথম সদস্যটিকে খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু কয়েক দশক পার হওয়ার পর আজ আধুনিক বিজ্ঞান সেই সংজ্ঞাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
১. হোমো হ্যাবিলিসের উত্থান ও নামকরণের প্রেক্ষাপট
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল যে মানুষের বিবর্তন শুরু হয়েছে 'হোমো ইরেক্টাস' (Homo erectus) থেকে। কিন্তু ওলডুভাই গর্জের আবিষ্কার সবকিছু বদলে দেয়। সেখানে এমন কিছু হাড়ের টুকরো পাওয়া যায় যেগুলোর মস্তিষ্কের আকার তৎকালীন পরিচিত 'বনমানুষ' বা অস্ট্রালোপিথেকাসদের চেয়ে কিছুটা বড় ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই জীবাশ্মগুলোর আশেপাশেই পাথরের তৈরি কিছু প্রাথমিক সরঞ্জাম বা হাতিয়ার পাওয়া গিয়েছিল।
বিজ্ঞানীরা যুক্তি দিলেন, যেহেতু এই প্রাণীটি পাথর ব্যবহার করে শিকার বা কাটার কাজ করতে পারত (তৎকালীন ধারণায় কেবল মানুষই তা পারত), তাই একে 'হোমো' বা মানব গণের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এভাবেই জন্ম হলো 'হোমো হ্যাবিলিস'-এর।
২. কেন এই প্রজাতিকে নিয়ে বিতর্ক?
{{/usCountry}}বিজ্ঞানীরা যুক্তি দিলেন, যেহেতু এই প্রাণীটি পাথর ব্যবহার করে শিকার বা কাটার কাজ করতে পারত (তৎকালীন ধারণায় কেবল মানুষই তা পারত), তাই একে 'হোমো' বা মানব গণের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এভাবেই জন্ম হলো 'হোমো হ্যাবিলিস'-এর।
২. কেন এই প্রজাতিকে নিয়ে বিতর্ক?
{{/usCountry}}বিতর্কের মূল কারণ হলো হোমো হ্যাবিলিসের শারীরিক গঠন। এটি ছিল এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। একাধারে এর মধ্যে যেমন মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, তেমনি অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য ছিল অবিকল বনমানুষের মতো।
মস্তিষ্কের আকার: হোমো হ্যাবিলিসের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল ৫০০ থেকে ৮০০ ঘন সেন্টিমিটারের মধ্যে। এটি আধুনিক মানুষের (১৪০০ ঘন সেমি) তুলনায় অনেক ছোট, আবার অস্ট্রালোপিথেকাসের (৪০০-৫০০ ঘন সেমি) চেয়ে সামান্য বড়। প্রশ্ন উঠেছে, কেবল মস্তিষ্কের সামান্য বড় আকারের ওপর ভিত্তি করে কি কাউকে 'মানুষ' বলা যায়?
হাতের গঠন ও গাছে চড়া: গবেষণায় দেখা গেছে, হোমো হ্যাবিলিসের হাত ছিল শরীরের তুলনায় বেশ লম্বা, যা ইঙ্গিত দেয় যে তারা মাটির চেয়ে গাছে চড়তেই বেশি অভ্যস্ত ছিল। মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দু-পায়ে সোজা হয়ে হাঁটা এবং মাটির ওপর স্থায়ীভাবে জীবনযাপন। এখানে হোমো হ্যাবিলিস অনেকটা পিছিয়ে।
মুখমণ্ডলের গঠন: এদের চোয়াল এবং দাঁত ছিল বনমানুষের মতো বড় ও শক্ত, যা শক্ত শিকড় বা কাঁচা মাংস চিবিয়ে খাওয়ার উপযোগী ছিল। আধুনিক মানুষের মতো কোমল মুখাবয়ব তাদের ছিল না।
৩. আধুনিক নৃবিজ্ঞানের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী বার্নার্ড উড এবং মার্ক কলামার্ডের মতো গবেষকরা মনে করেন, হোমো হ্যাবিলিসকে 'হোমো' বা মানব গণে রাখা ভুল ছিল। তাঁদের মতে, এটি আসলে 'অস্ট্রালোপিথেকাস হ্যাবিলিস' হওয়া উচিত ছিল। তাঁদের যুক্তিতে, বিবর্তনের ধারায় হ্যাবিলিস আসলে সেই সন্ধিক্ষণের প্রাণী যারা বনমানুষের সীমা ছাড়িয়ে মানুষের দিকে এগোচ্ছিল, কিন্তু তখনও তারা পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে ওঠেনি।
আগে ধারণা করা হতো বিবর্তন একটি মইয়ের মতো—প্রথমে অস্ট্রালোপিথেকাস, তারপর হ্যাবিলিস, তারপর ইরেক্টাস এবং সবশেষে সেপিয়েন্স বা আমরা। কিন্তু নতুন জীবাশ্ম প্রমাণ বলছে, হ্যাবিলিস এবং ইরেক্টাস হয়তো একই সময়ে পৃথিবীতে পাশাপাশি বাস করত। যদি হ্যাবিলিস থেকেই ইরেক্টাসের জন্ম হতো, তবে তাদের একসাথে বাস করার কথা নয়। এটি ইঙ্গিত দেয় যে হোমো হ্যাবিলিস হয়তো বিবর্তনের একটি 'ডেড এন্ড' বা শাখা ছিল যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
৪. হাতিয়ার তৈরির কৃতিত্ব কি কেবল মানুষের?
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করা হতো যে 'হোমো' গণের সদস্যরাই প্রথম পাথর ব্যবহার করে হাতিয়ার তৈরি করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কেনিয়ায় ৩.৩ মিলিয়ন বছর পুরনো পাথরের সরঞ্জাম আবিষ্কৃত হয়েছে, যা হোমো হ্যাবিলিসের আবির্ভাবের অনেক আগের। এর অর্থ হলো, অস্ট্রালোপিথেকাসরাও পাথর ব্যবহার করতে জানত। যদি পাথর ব্যবহার করাই মানুষের প্রধান শর্ত হয়, তবে অস্ট্রালোপিথেকাসদেরও কি মানুষ বলা উচিত? এই আবিষ্কার হোমো হ্যাবিলিসকে 'মানুষ' বলার প্রধান যুক্তিটিকে দুর্বল করে দিয়েছে।
৫. ডায়েট ও অভিযোজন
দাঁতের আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে হোমো হ্যাবিলিস কেবল নরম ফলমূল নয়, বরং ঘাস ও মাটির নিচের শিকড় জাতীয় শক্ত খাবারও খেত। এই বহুমুখী খাদ্যভ্যাস তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করত। তবে তাদের পায়ের হাড় ও গোড়ালি পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা দ্বিধাবিভক্ত। কেউ মনে করেন তারা দক্ষভাবে হাঁটতে পারত, আবার কেউ মনে করেন তাদের হাঁটাচলা ছিল বেশ অগোছালো এবং বনমানুষের মতো।
৬. তবে কি সেপিয়েন্সের পূর্বপুরুষ হ্যাবিলিস নয়?
বিবর্তনের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে আমরা বুঝতে পারছি যে 'মানুষ' কথাটির সংজ্ঞা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। যদি হোমো হ্যাবিলিসকে কেবল মস্তিষ্কের আয়তন বা হাতিয়ার তৈরির জন্য মানুষ বলা হয়, তবে অনেক বনমানুষকেও সেই সংজ্ঞায় আনতে হবে। আবার যদি কেবল শারীরিক গঠন দেখা হয়, তবে হ্যাবিলিস একজন মানুষের চেয়ে বনমানুষের অনেক বেশি কাছাকাছি।
বর্তমানে অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, 'হোমো হ্যাবিলিস' হলো একটি 'ট্যাক্সোনমিক ওয়েস্টবাস্কেট' (Taxonomic wastebasket)। অর্থাৎ, মানুষের বিবর্তনের যে অংশগুলো আমরা ঠিকমতো ব্যাখ্যা করতে পারছি না, সেগুলোকে আমরা হ্যাবিলিস বলে চালিয়ে দিচ্ছি। ভবিষ্যতে ডিএনএ বিশ্লেষণ বা নতুন জীবাশ্ম হয়তো এই বিতর্কের অবসান ঘটাবে। কিন্তু ততক্ষণ পর্যন্ত, হোমো হ্যাবিলিস আমাদের ইতিহাসের পাতায় এক রহস্যময় চরিত্র হয়েই থাকবে—যাকে আমরা পুরোপুরি 'আমাদের' বলতে পারছি না, আবার পুরোপুরি বনমানুষ হিসেবেও ত্যাগ করতে পারছি না।