কূটনীতির ভাষায় বারবারই বলা হয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই। কিন্তু ভারতের অভিজ্ঞতা যে সেই সরল হিসাবের সঙ্গে সব সময় মেলে না, তা ফের মনে করিয়ে দিলেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে তিনি স্পষ্ট জানালেন, দেশের কঠিন সময়ে কে পাশে দাঁড়িয়েছিল, তা দিল্লি কখনও ভুলে যায় না।

রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে নিজের বক্তব্যে জয়শঙ্কর বলেন, দেশের নিরাপত্তা এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতা যখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরে রাশিয়া ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছিল। সেই সময় বিশ্বের একটি বড় অংশ পাকিস্তানের সামরিক শাসনের পাশে ছিল। কিন্তু মস্কোর অবস্থান ছিল আলাদা। আর সেই ইতিহাসই ভারতের কূটনৈতিক স্মৃতিতে এখনও অমলিন বলে বার্তা দিয়েছেন তিনি।
পুরনো সম্পর্কের প্রসঙ্গ কেন?
ভারত রাশিয়ার সম্পর্ক শুধু অস্ত্র কেনাবেচা বা কূটনৈতিক সৌজন্যের উপর দাঁড়িয়ে নেই। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে। প্রতিরক্ষা, মহাকাশ, পরমাণু শক্তি, জ্বালানি থেকে শুরু করে কৌশলগত নিরাপত্তা, একাধিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা হয়েছে দুই দেশের।
জয়শঙ্করের বক্তব্যে সেই দীর্ঘ সম্পর্কের রাজনৈতিক গুরুত্বই সামনে এসেছে। তাঁর কথায়, অতীতে কোনও দেশ ভারতের পাশে দাঁড়ালে দিল্লি তা মনে রাখে। অর্থাৎ বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সমীকরণ যতই বদলাক, পুরনো সহযোগিতার মূল্য ভারতের কাছে এখনও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তান প্রসঙ্গেও বার্তা
জয়শঙ্করের বক্তব্যে পাকিস্তানের নাম সরাসরি সামনে আসায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর ইঙ্গিত, এমন একটা সময়ে যখন বহু দেশ পাকিস্তানের সামরিক শাসনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের নিরাপত্তার প্রশ্নে আলাদা অবস্থান নিয়েছিল।
{{/usCountry}}জয়শঙ্করের বক্তব্যে পাকিস্তানের নাম সরাসরি সামনে আসায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর ইঙ্গিত, এমন একটা সময়ে যখন বহু দেশ পাকিস্তানের সামরিক শাসনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের নিরাপত্তার প্রশ্নে আলাদা অবস্থান নিয়েছিল।
{{/usCountry}}এই ইতিহাস মনে রাখার অর্থ অবশ্য এই নয় যে ভারত রাশিয়ার সব অবস্থানকে নিঃশর্ত সমর্থন করে। বরং দিল্লির কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, নিজের স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। রাশিয়ার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক যেমন রয়েছে, তেমনই আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশের সঙ্গেও ভারতের কৌশলগত যোগাযোগ রয়েছে।
‘রাশিয়ার সঙ্গে অভিজ্ঞতা ইতিবাচক’
জয়শঙ্কর আরও বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের অভিজ্ঞতা ধারাবাহিক ভাবে ইতিবাচক। এই মন্তব্যে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা যেমন উঠে আসে, তেমনই আন্তর্জাতিক নানা সঙ্কটে দুই দেশের পারস্পরিক যোগাযোগের কথাও সামনে আসে।
বিশেষ করে অস্ত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে রাশিয়া বহু দশক ধরে ভারতের অন্যতম প্রধান অংশীদার। সুখোই যুদ্ধবিমান, মিগ সিরিজ, টি ৯০ ট্যাঙ্ক, ব্রহ্মোসের মতো প্রকল্প থেকে শুরু করে পরমাণু শক্তি, বিভিন্ন ক্ষেত্রেই দুই দেশের সহযোগিতা তৈরি হয়েছে। সময়ের সঙ্গে ভারত অবশ্য প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের উৎসও আরও বৈচিত্র্যময় করেছে।
বর্তমানেও বন্ধুত্বের পরীক্ষা
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমী বিশ্বের সম্পর্ক ব্যাপক ভাবে খারাপ হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে ভারত একদিকে মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে, অন্যদিকে পশ্চিমী দেশগুলির সঙ্গেও সম্পর্ক অটুট রেখেছে। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার বিষয়েও দিল্লি নিজের জাতীয় স্বার্থের কথা স্পষ্ট করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে জয়শঙ্করের বক্তব্যকে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক নীতিরই প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বার্তাটা মূলত একটাই। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিস্থিতি বদলাতে পারে, নতুন জোট তৈরি হতে পারে, পুরনো সমীকরণও ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু ভারতের বিপদের সময়ে যারা পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের ভূমিকা দিল্লির স্মৃতিতে থেকে যায়।
রাশিয়াকে নিয়ে জয়শঙ্করের বক্তব্য তাই শুধু অতীত স্মরণ নয়। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির মধ্যেও পুরনো অংশীদারিত্বের গুরুত্ব কতটা, সেই বার্তাও স্পষ্ট করে দিল ভারত।