দু’বছর আগে মুম্বইয়ের নৌঘাঁটিতে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল ভারতীয় নৌসেনার যুদ্ধজাহাজ আইএনএস ব্রহ্মপুত্র। আগুন লাগার পর একদিকে কাত হয়ে পড়েছিল ৩৮৫০ টনের যুদ্ধজাহাজটি। প্রাণ হারিয়েছিলেন এক নৌসেনা কর্মী। সেই ঘটনায় এবার বড় পদক্ষেপ করল ভারতীয় নৌবাহিনী। দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে দুই আধিকারিকের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে কোর্ট মার্শাল। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন যুদ্ধজাহাজটির তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার, যিনি ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার আধিকারিক। অন্য জন লেফটেন্যান্ট কমান্ডার পদমর্যাদার অফিসার। ১২ অক্টোবর মুম্বইয়ে সামরিক আদালতে এই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রায় দু’বছর ধরে তদন্তের পর এই পদক্ষেপকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কী অভিযোগ দুই আধিকারিকের বিরুদ্ধে?

হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৎকালীন কমান্ডিং অফিসারের বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথমত, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি। দ্বিতীয়ত, নৌসেনার একটি যুদ্ধজাহাজকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। সামরিক পরিভাষায় দ্বিতীয় অভিযোগটিকে বলা হয় ‘হ্যাজার্ডিং আ নেভাল শিপ’। অন্য দিকে, সেই দিন ডিউটিতে থাকা লেফটেন্যান্ট কমান্ডারের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে দুই আধিকারিকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এখনও প্রমাণিত হয়নি। সামরিক আদালতেই তা খতিয়ে দেখা হবে। দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁদের সতর্ক করা, পদোন্নতি বা চাকরির জ্যেষ্ঠতা কমানো থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ দু’বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
কী ঘটেছিল ২০২৪ সালে?
২০২৪ সালের ২১ জুলাই মুম্বইয়ের নেভাল ডকইয়ার্ডে মেরামতির কাজ চলছিল আইএনএস ব্রহ্মপুত্রের। সেই সময় আচমকাই যুদ্ধজাহাজটিতে আগুন লাগে। আগুন নেভাতে জাহাজের কর্মীদের পাশাপাশি নৌঘাঁটির দমকলকর্মীরাও কাজে হাত লাগান। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে জাহাজের ভিতরে প্রচুর পরিমাণে জল ঢালতে হয়েছিল। কিন্তু তার পরেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। ভারসাম্য হারিয়ে একদিকে কাত হতে শুরু করে যুদ্ধজাহাজটি। শেষ পর্যন্ত এক পাশে হেলে গিয়ে প্রায় উল্টে যায় সেটি।
বেশির ভাগ কর্মী গ্যাংওয়ে দিয়ে জাহাজ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। কয়েক জনকে আবার জলে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে হয়। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিখোঁজ হয়ে যান লিডিং সিম্যান সিতেন্দ্র সিং। পরে তল্লাশি চালিয়ে তাঁর দেহ উদ্ধার করা হয়।
এখনও পুরোপুরি সচল হয়নি যুদ্ধজাহাজ
{{/usCountry}}বেশির ভাগ কর্মী গ্যাংওয়ে দিয়ে জাহাজ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। কয়েক জনকে আবার জলে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে হয়। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে নিখোঁজ হয়ে যান লিডিং সিম্যান সিতেন্দ্র সিং। পরে তল্লাশি চালিয়ে তাঁর দেহ উদ্ধার করা হয়।
এখনও পুরোপুরি সচল হয়নি যুদ্ধজাহাজ
{{/usCountry}}কলকাতার গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (জিআরএসই)-এ তৈরি হয়েছিল আইএনএস ব্রহ্মপুত্র। ২০০০ সালের এপ্রিলে নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় এই যুদ্ধজাহাজ। এর দৈর্ঘ্য ১২৫ মিটার এবং প্রস্থ ১৬ মিটার। প্রায় ৩৭০ জন কর্মী থাকতে পারেন জাহাজটিতে। একসময় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে জাহাজটিকে আদৌ সমুদ্রে ফেরানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত কয়েক মাসের উদ্ধার অভিযানের পর জাহাজটিকে সোজা করা সম্ভব হয়। মেরামতির কাজও শেষ হয়েছে। বর্তমানে চলছে বিভিন্ন পরীক্ষা। তবে এখনও নৌবাহিনীর নিয়মিত কাজে ফেরেনি আইএনএস ব্রহ্মপুত্র। ২০২৭ সালে সেটি ফের সমুদ্রে নামতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বদল
এই দুর্ঘটনার পর নৌবাহিনীর তৎকালীন প্রধান অ্যাডমিরাল দীনেশ কে ত্রিপাঠী একজন রিয়ার অ্যাডমিরালের নেতৃত্বে বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করেছিলেন। নৌঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখে ওই কমিটি একাধিক সুপারিশ করে। পরে বিভিন্ন নৌ কমান্ড ও ঘাঁটিতে সেই নির্দেশিকা কার্যকর করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরেও মুম্বইয়ের একই নৌঘাঁটিতে মেরামতির সময় আইএনএস বেতওয়া উল্টে গিয়েছিল। সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন দুই নৌসেনা কর্মী। আহত হয়েছিলেন ১৪ জন। সেই ঘটনায়ও তিন আধিকারিকের কোর্ট মার্শাল হয়েছিল। ফলে আইএনএস ব্রহ্মপুত্রের ঘটনায় শুরু হওয়া বিচারপ্রক্রিয়া শুধু দুই আধিকারিকের দায়িত্ব নির্ধারণ নয়, ভারতীয় নৌবাহিনীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।