তিন বছর পরেও মণিপুরের হিংসার ক্ষত পুরোপুরি শুকোয়নি। রবিবার ফের রক্তাক্ত হল উত্তর-পূর্বের এই রাজ্য। তামেংলং জেলার দুটি গ্রামে অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র হামলাকারীদের গুলিতে অন্তত চার গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়েছে। হামলায় গুরুতর আহত হয়েছে এক শিশু। একই ঘটনায় এক মহিলা নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। পরপর এই হামলার ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে এলাকায়।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার ভোররাতে তামেংলং জেলার তোলেন গ্রামে প্রথম হামলা হয়। অভিযোগ, সশস্ত্র হামলাকারীরা একটি বাড়িতে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিতে গুরুতর জখম হন এক যুবক, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের ছয় বছরের ছেলে। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই দম্পতির মৃত্যু হয়। তাঁদের ছেলেটিও গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
প্রথম হামলার কয়েক ঘণ্টা পর দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে লংপি গ্রামে। দুপুরের দিকে গ্রামের রাস্তা ধরে তিন জন বাড়ি ফিরছিলেন। সেই সময় তাঁদের উপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। গুলিতে ঘটনাস্থলেই দু’জনের মৃত্যু হয়। তৃতীয় এক মহিলা নিখোঁজ হয়ে যান। হামলাকারীরা তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত তথ্য মেলেনি। তবে স্থানীয়দের মধ্যে এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরপর হামলার পর এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কুকি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠন অভিযোগ করেছে, এই হামলার নেপথ্যে সশস্ত্র নাগা গোষ্ঠীর হাত থাকতে পারে। যদিও হামলাকারীদের পরিচয় এবং হামলার সঠিক কারণ এখনও সরকারি ভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে তদন্তের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচন্দ সিং হামলার তীব্র নিন্দা করেছেন। তিনি বলেন, নিরীহ মানুষের উপর এ ধরনের কাপুরুষোচিত হামলা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। সমাজে এই ধরনের অপরাধের কোনও জায়গা নেই বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের তরফে একটি বিবৃতি দিয়ে ঘটনার নিন্দা করা হয়েছে এবং এলাকায় শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানানো হয়েছে।
{{/usCountry}}ঘটনার পর মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচন্দ সিং হামলার তীব্র নিন্দা করেছেন। তিনি বলেন, নিরীহ মানুষের উপর এ ধরনের কাপুরুষোচিত হামলা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। সমাজে এই ধরনের অপরাধের কোনও জায়গা নেই বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের তরফে একটি বিবৃতি দিয়ে ঘটনার নিন্দা করা হয়েছে এবং এলাকায় শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানানো হয়েছে।
{{/usCountry}}হামলার পর তামেংলংয়ের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। প্রশাসনের তরফে উত্তেজনা ছড়ায় এমন কোনও ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়েও সতর্কতা জারি রয়েছে।
এই হামলার সময়টিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৩ সেপ্টেম্বর কুকি সম্প্রদায়ের কাছে ‘ব্ল্যাক ডে’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯২ সালে মণিপুরে কুকি-নাগা জাতিগত সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। প্রায় ছয় বছর ধরে চলা সেই সংঘর্ষে এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়। সেই সময়ের নিহতদের স্মরণে প্রতি বছর ১৩ সেপ্টেম্বর দিনটি পালন করেন কুকিরা।
ফলে ‘ব্ল্যাক ডে’-র সঙ্গে মিলিয়ে এ বছরের হামলা নতুন করে ক্ষোভ ও আশঙ্কা বাড়িয়েছে। কুকি সংগঠনগুলির একাংশের অভিযোগ, অতীতের সেই সংঘর্ষের স্মৃতিকে সামনে রেখে আবারও উত্তেজনা উসকে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। যদিও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
মণিপুরে দীর্ঘদিনের জাতিগত সংঘাতের আবহে এই নতুন হামলা প্রশাসনের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কুকি ও নাগা অধ্যুষিত এলাকায় নতুন করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রবিবারের ঘটনার পূর্ণ তদন্তের পাশাপাশি নিখোঁজ মহিলার সন্ধান এবং হামলাকারীদের শনাক্ত করার দিকেও নজর দিয়েছে প্রশাসন।
তিন বছরের বেশি সময় ধরে অশান্তির ছায়া বয়ে চলা মণিপুরে নতুন করে এই রক্তপাত তাই যথেষ্ট উদ্বেগের। একটি শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়া, চার জনের মৃত্যু এবং একজন মহিলার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় স্পষ্ট, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও কতটা স্পর্শকাতর।