স্বামীর জোর করে যৌনসম্পর্কে বাধ্য করা হলে সেই মহিলা ‘নিঃসন্দেহে ভুক্তভোগী’। বুধবার এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল সুপ্রিম কোর্ট। তবে একই সঙ্গে আদালত প্রশ্ন তুলেছে, বর্তমান আইনে যখন বৈবাহিক সম্পর্কে জোর করে যৌনসম্পর্ককে ধর্ষণের অপরাধ থেকে স্পষ্ট ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, তখন এমন স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করা যায় কি না। বিষয়টি নিয়ে একাধিক মামলার শুনানি চলছে সুপ্রিম কোর্টে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনা।
আইনের বর্তমান অবস্থাই বড় প্রশ্ন

ভারতের প্রচলিত আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর যৌনসম্পর্ককে ধর্ষণের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় থাকা এই ব্যতিক্রম এখন ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা বিএসএনেও বহাল রয়েছে। এই আইনি ব্যতিক্রমই চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। প্রশ্ন হল, কোনও স্ত্রী যদি তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামীর সঙ্গে যৌনসম্পর্কে বাধ্য হন, তা হলে স্বামীকে ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্ত করা যাবে কি না।
আদালত বলেছে, এই প্রশ্নের সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। কোনও কাজকে আইন যখন নির্দিষ্ট ভাবে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে এবং সেই একই আইনে একটি ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছে, তখন আদালত কি সেই ব্যতিক্রমকে এমন ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, যাতে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা সম্ভব হয়?
কর্ণাটকের মামলাও গুরুত্বপূর্ণ
এই মামলাগুলির মধ্যে কর্ণাটক হাই কোর্টের একটি রায়ও রয়েছে। সেখানে এক স্বামীর বিরুদ্ধে তাঁর স্ত্রীকে প্রায় ‘যৌনদাসী’র মতো ব্যবহার করার অভিযোগ ছিল। কর্ণাটক হাই কোর্ট সেই স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা চালানোর পথ খুলে দিয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্ট এবার সেই মামলাটিকেই আগে শুনে দেখতে চাইছে। আদালতের বক্তব্য, বর্তমান আইনকে আদালত কি এমন ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, যাতে বৈবাহিক সম্পর্কের এই ব্যতিক্রম থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা চালানো যায়।
‘স্ত্রী নিঃসন্দেহে ভুক্তভোগী’
{{/usCountry}}সুপ্রিম কোর্ট এবার সেই মামলাটিকেই আগে শুনে দেখতে চাইছে। আদালতের বক্তব্য, বর্তমান আইনকে আদালত কি এমন ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, যাতে বৈবাহিক সম্পর্কের এই ব্যতিক্রম থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা চালানো যায়।
‘স্ত্রী নিঃসন্দেহে ভুক্তভোগী’
{{/usCountry}}শুনানির সময় বেঞ্চ স্পষ্ট করে জানায়, স্বামীর দ্বারা জোর করে যৌনসম্পর্কের শিকার হওয়া মহিলা অবশ্যই ভুক্তভোগী। অর্থাৎ আদালত জোর করে যৌনসম্পর্কের ফলে স্ত্রীর উপর হওয়া ক্ষতিকে অস্বীকার করছে না। তবে ভুক্তভোগী হওয়া এবং বিদ্যমান আইনের অধীনে ধর্ষণের মামলা করা—এই দুটি প্রশ্ন এক নয়। আদালতের সামনে মূল আইনি চ্যালেঞ্জ হল, বর্তমান আইনের সীমার মধ্যে থেকে এ ধরনের ঘটনায় স্বামীকে ধর্ষণের অপরাধে শাস্তি দেওয়া সম্ভব কি না।
ইন্দিরা জয়সিংয়ের যুক্তি
কর্ণাটকের মামলায় স্ত্রীর হয়ে সওয়াল করা প্রবীণ আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং বলেন, হাই কোর্ট সরাসরি আইনের ওই ব্যতিক্রম বাতিল করেনি। বরং বিদ্যমান আইনকে ব্যাখ্যা করে বিশেষ পরিস্থিতিতে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা চালানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে সুপ্রিম কোর্ট এই ব্যাখ্যার সীমা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে। কারণ আইনে যখন একটি বিষয়কে স্পষ্ট ভাবে ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করা রয়েছে, তখন আদালতের ব্যাখ্যার মাধ্যমে সেটিকে এমন ভাবে বদলানো যায় কি না, যাতে ফৌজদারি দায় তৈরি হয়—সেটিই এখন বড় আইনি প্রশ্ন।
আগে কর্ণাটকের মামলা, পরে সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, সম্ভবত প্রথমে কর্ণাটকের মামলাটি শুনে দেখা হবে। সেখানে বিদ্যমান আইনের ব্যাখ্যা করে স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা চালানোর সুযোগ রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে। এর পর বৈবাহিক ধর্ষণের ক্ষেত্রে স্বামীকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া ধারাটির সাংবিধানিক বৈধতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা মামলাগুলি শোনা হবে।
তিন সপ্তাহ পর ফের শুনানি
শুনানির শেষে আদালত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির নথিপত্র এবং মামলাগুলির সব তথ্য একত্র করার নির্দেশ দিয়েছে। তিন সপ্তাহ পর মামলাগুলি ফের শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ফলে বুধবারের শুনানিতে কোনও চূড়ান্ত রায় হয়নি। তবে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে একটি বিষয় স্পষ্ট—বৈবাহিক সম্পর্কে জোর করে যৌনসম্পর্কের শিকার স্ত্রীকে আদালত ভুক্তভোগী হিসেবেই দেখছে। এখন মূল প্রশ্ন, সেই ঘটনার জন্য বর্তমান আইনের কাঠামোর মধ্যে স্বামীকে ধর্ষণের অপরাধে বিচারের মুখোমুখি করা যায় কি না। এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতে বৈবাহিক ধর্ষণ নিয়ে ভারতের আইনি অবস্থানের উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।