বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম (চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস বা সিএইচটি) থেকে উদ্বাস্তুদের ক্রমবর্ধমান অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করল মিজোরাম সরকার। রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে সাপডাঙ্গা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা জো (Zo) জনগোষ্ঠী-সহ অন্যান্য উদ্বাস্তুদের কীভাবে গ্রহণ ও পুনর্বাসন করা হবে, সে বিষয়ে রাজ্য সরকারের একটি সুস্পষ্ট নীতি প্রণয়ন করা জরুরি। তাঁর মতে, বিষয়টি শুধু মানবিক নয়, একই সঙ্গে নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। তাই এ নিয়ে দ্রুত ও গুরুত্বের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

আইজলে ‘বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর বাড়তে থাকা নিপীড়ন এবং চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস শান্তিচুক্তির প্রভাব’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সম্প্রতি সাপডাঙ্গা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী জো জনগোষ্ঠী ক্রমশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের চাপের মুখে পড়ছে। তাঁদের পূর্বপুরুষের জমি দখল হয়ে যাচ্ছে এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহু মানুষ বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে আসছেন। এই পরিস্থিতিতে উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি মিজোরামের নিরাপত্তার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
তিনি জানান, শুধু জো জনগোষ্ঠী নয়, চাকমা এবং ব্রু সম্প্রদায়ের বহু মানুষও বাংলাদেশ থেকে বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন। তাঁদের পাশে দাঁড়াতে মিজোরামের বিভিন্ন চার্চ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং রাজনৈতিক দল এগিয়ে এসেছে। তবে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হওয়ায় সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করতেই হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা জো জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষকে কীভাবে গ্রহণ করা হবে, কোথায় রাখা হবে এবং কীভাবে তাঁদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে, সে বিষয়ে সরকারকে গভীরভাবে ভাবতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই সেমিনার সরকারের পাশাপাশি চার্চ, জনজাতি সংগঠন এবং নাগরিক সমাজকে সমস্যার গভীরতা বুঝতে সাহায্য করবে।
মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং বিধায়ক লালমুয়ানপুইয়া পুন্তেও সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, প্রতিবেশী অঞ্চলের মানুষ কেন মিজোরামে আসছেন এবং তাঁদের বাস্তব পরিস্থিতি কী, তা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবেই সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারবে।
{{/usCountry}}মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং বিধায়ক লালমুয়ানপুইয়া পুন্তেও সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, প্রতিবেশী অঞ্চলের মানুষ কেন মিজোরামে আসছেন এবং তাঁদের বাস্তব পরিস্থিতি কী, তা বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবেই সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারবে।
{{/usCountry}}মিজোরামের লংতলাই, লুংলেই এবং মামিত জেলা মিলিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রায় ৩১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। এই দীর্ঘ সীমান্তের কারণেই বাংলাদেশ থেকে উদ্বাস্তুদের প্রবেশ নিয়ে রাজ্য প্রশাসনের উদ্বেগ বাড়ছে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভিযানের জেরে পার্বত্য চট্টগ্রামের জো জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত বম (Bawm) সম্প্রদায়ের দুই হাজারেরও বেশি মানুষ মিজোরামে আশ্রয় নিয়েছেন।
অন্যদিকে, মিজোরামের বৃহত্তম সামাজিক সংগঠন ইয়াং মিজো অ্যাসোসিয়েশন (ওয়াইএমএ), মিজো জিরলাই পওল (এমজেডপি) এবং মিজো স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (এমএসইউ)-সহ বিভিন্ন সংগঠনও বাংলাদেশ থেকে, বিশেষ করে চাকমা সম্প্রদায়ের অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাঁদের আশঙ্কা, নিয়ন্ত্রণহীন অনুপ্রবেশ ভবিষ্যতে রাজ্যের সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই সেমিনারের প্রেক্ষাপট আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)-এর সাম্প্রতিক মানবাধিকার প্রতিবেদনের কারণে। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে নথিভুক্ত ৫৭টি ঘটনায় অন্তত ১৫৪ জন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ১০টি মৃত্যু, সাধারণ মানুষের উপর হামলা, জমি দখল, সেনাবাহিনীর অভিযানের অভিযোগ, নারী নির্যাতন এবং অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণ।
পিসিজেএসএসের অভিযোগ, এই ঘটনাগুলির মধ্যে ২৪টিতে নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-এর বিভিন্ন গোষ্ঠী, মারমা লিবারেশন পার্টি এবং কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের মতো সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধেও একাধিক ঘটনার অভিযোগ তোলা হয়েছে। পাশাপাশি বাঙালি বসতি স্থাপনকারী, ভূমিদস্যু এবং রোহিঙ্গা জঙ্গিদের বিরুদ্ধেও খুন, হামলা এবং জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, বাংলাদেশে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি কার্যকর করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। রাজনৈতিক আলোচনার পরিবর্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের উপর নির্ভর করায় দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান আরও জটিল হয়ে উঠছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। এই পরিস্থিতির জেরেই সীমান্ত পেরিয়ে উদ্বাস্তুদের সংখ্যা বাড়ছে, যা নিয়ে এখন উদ্বেগ বাড়ছে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্য মিজোরামেও।