২৫ বছরের প্রশাসনিক সফর। এক দিকে ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন, অন্য দিকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান। বুধবার দিল্লিতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কথায় বার বার উঠে এল শক্তিশালী ভারতের ছবি। আর সেই ভাষণেই নাম না করে পাকিস্তানকে যেন ফের পুরনো বার্তা মনে করিয়ে দিলেন তিনি। সার্জিক্যাল স্ট্রাইক থেকে শুরু করে অপারেশন সিঁদুর—সন্ত্রাসের জবাব দিতে ভারত যে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেই অবস্থান স্পষ্ট করলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মুখে শোনা গেল, ‘‘ঘর মে ঘুসকে মারা’’।

২০০১ সালের ৭ অক্টোবর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন মোদী। সেই দিন থেকে প্রশাসনের শীর্ষে তাঁর পথচলা। ২৫ বছর পূর্তির এই বিশেষ আয়োজনে তাই শুধু অতীতের সাফল্যের হিসাব নয়, আগামী ভারতের রূপরেখাও তুলে ধরলেন তিনি। ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য সামনে রেখে বললেন, আত্মনির্ভরতার পথেই এগোতে হবে। তাঁর কথায়, লক্ষ্য বড় হতে হবে, আর সেই লক্ষ্য পূরণে দরকার অদম্য আত্মবিশ্বাস। অনুষ্ঠানে তাঁর দেওয়া স্লোগান—‘উই উইল ডু ইট’, অর্থাৎ ‘আমরা করে দেখাবই’।
কিন্তু ভাষণের অন্য একটি অংশে আচমকাই বদলে যায় সুর। উন্নয়ন, অর্থনীতি, প্রযুক্তি কিংবা আত্মনির্ভরতার পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ টানেন প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তানের নাম সরাসরি না নিলেও কথার নিশানা যে কোথায়, তা বুঝতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলতে গিয়ে তিনি মনে করিয়ে দেন, ভারতের মাটিতে হামলার জবাব সীমান্তের ওপারেও পৌঁছতে পারে। সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পর থেকে যে নীতি ভারতের নিরাপত্তা কৌশলের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছে, অপারেশন সিঁদুরের উল্লেখে সেটিকেই আরও এক বার সামনে আনলেন তিনি।
৩৭০ থেকে সন্ত্রাস দমন, বদলের দাবি মোদীর
মোদীর ভাষণে জম্মু ও কাশ্মীরের প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে তাঁর সরকার ভারতের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসের বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখে। সেই সিদ্ধান্তের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, দীর্ঘদিনের জটিল প্রশ্নে তাঁর সরকার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয়নি। একই সঙ্গে মাওবাদমুক্ত ভারতের লক্ষ্য এবং জঙ্গি দমনের কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।
{{/usCountry}}মোদীর ভাষণে জম্মু ও কাশ্মীরের প্রসঙ্গও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ৩৭০ ধারা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে তাঁর সরকার ভারতের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসের বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখে। সেই সিদ্ধান্তের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, দীর্ঘদিনের জটিল প্রশ্নে তাঁর সরকার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয়নি। একই সঙ্গে মাওবাদমুক্ত ভারতের লক্ষ্য এবং জঙ্গি দমনের কথাও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।
{{/usCountry}}তাঁর বক্তব্যে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত ছিল আত্মনির্ভরতার প্রসঙ্গও। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, প্রযুক্তি ও মহাকাশ গবেষণায় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সেমিকন্ডাক্টরের মতো নতুন শিল্পে ভারতের উপস্থিতি জোরদার করার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, শক্তিশালী ভারত বলতে শুধু বড় অর্থনীতি নয়, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত ক্ষমতায় আত্মনির্ভর দেশকেও বোঝায়।
‘কর্মই ধর্ম’, কিন্তু নিরাপত্তায় আপস নয়
২৫ বছরের প্রশাসনিক জীবনের মূল্যায়ন করতে গিয়ে নিজেকে ‘সেবক’ হিসেবেই তুলে ধরেছেন মোদী। গীতার ‘মা ফলেষু কদাচন’ উদ্ধৃত করে বলেছেন, ফলের চিন্তা না করে কাজ করে যাওয়াই তাঁর সংকল্প। জনতার আস্থা এবং কর্মীদের পরিশ্রমকেই নিজের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি। বলেছেন, প্রতিটি সাফল্য তাঁকে আরও বড় দায়িত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে, আর প্রতিটি সংকট শিখিয়েছে ধৈর্য।
এই আবেগঘন আত্মমূল্যায়নের মাঝেই পাকিস্তানের উদ্দেশে কঠিন বার্তা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মোদী বুঝিয়ে দিয়েছেন, ভারতের উন্নয়নযাত্রা যেমন থামবে না, তেমনই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইও নরম হওয়ার নয়। কূটনৈতিক ভাষায় সরাসরি প্রতিবেশীর নাম না নিয়েও ‘ঘরে ঢুকে মারা’-র বার্তা দিয়ে তিনি কার্যত জানিয়ে দিলেন—সীমান্তপারের সন্ত্রাস হলে তার জবাব সীমান্তের হিসাব মেনে দেওয়া নাও হতে পারে। ২৫ বছরের প্রশাসনিক যাত্রার মঞ্চে তাই মোদীর বার্তার দুই মুখ—এক দিকে ‘বিকশিত ভারত’, অন্য দিকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর ভারত।