লন্ডনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) কাজের মূল দর্শন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিলেন সংঘের সরসংঘচালক মোহন ভাগবত। রবিবার লন্ডনে আয়োজিত এক সভায় তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আরএসএসের কাজের ভিত্তি ‘তীব্র ঘৃণা’ নয়, বরং ‘শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেম’। তাঁর বক্তব্য, পারস্পরিক আপনত্ব, একাত্মবোধ এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাই সংঘের কর্মকাণ্ডের মূল ভিত্তি।

লন্ডনে ‘সেলিব্রেশন অব ওয়াননেস’ বা ‘একাত্মতার উদযাপন’ শীর্ষক এক সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভাগবত বলেন, কেউ কেউ মনে করেন তীব্র ঘৃণাই আরএসএসের কাজের চালিকাশক্তি। কিন্তু বাস্তব চিত্র তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি বলেন, “শুদ্ধ সাত্ত্বিক প্রেমই আমাদের কাজের ভিত্তি।” তাঁর দাবি, এক শতাব্দী পেরিয়েও এই ভাবনা আরএসএসের স্বয়ংসেবকদের আচরণ এবং সংগঠনের পরিবেশে অটুট রয়েছে।
ভাগবতের বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় ‘আপনাপন’ বা আপনত্বের ধারণা। তাঁর মতে, এই বোধ শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে সমগ্র মানবতার সঙ্গে একাত্মতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। হিন্দু সভ্যতার প্রকৃতিও এই দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, হিন্দুরা শুধু প্রকৃতিকে উপাসনা করেন না, প্রকৃতিকে ভালোওবাসেন।
বিশ্বজুড়ে সংঘাত, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সংকট এবং ডিজিটাল যুগের দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে হিন্দু সভ্যতা বিশ্বকে কী দিতে পারে—এই প্রশ্নেরও উত্তর দেন ভাগবত। তিনি বলেন, হিন্দু চিন্তার অন্যতম মূল ভিত্তি হল ‘সমস্ত অস্তিত্ব এক’। পৃথিবীতে বৈচিত্র্য স্বাভাবিক এবং সেই বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে হবে। তবে বৈচিত্র্যের মধ্যে যে মৌলিক ঐক্য রয়েছে, সেটিকেও মনে রাখতে হবে।
ভাগবতের মতে, মানুষ যদি একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু হিসেবে না দেখে পারস্পরিক প্রয়োজনের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে সংঘাত কমানো সম্ভব। তাঁর বক্তব্য, ‘আমি পাব, অন্যজন পাবে না’—এই মানসিকতার পরিবর্তে ‘আমি এবং অন্যজন দু’জনেই পাব’ ধরনের চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে হবে। এর ফলে প্রতিযোগিতা ও বৈরিতার পরিবর্তে ‘উইন-উইন’ সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
{{/usCountry}}ভাগবতের মতে, মানুষ যদি একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু হিসেবে না দেখে পারস্পরিক প্রয়োজনের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে সংঘাত কমানো সম্ভব। তাঁর বক্তব্য, ‘আমি পাব, অন্যজন পাবে না’—এই মানসিকতার পরিবর্তে ‘আমি এবং অন্যজন দু’জনেই পাব’ ধরনের চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে হবে। এর ফলে প্রতিযোগিতা ও বৈরিতার পরিবর্তে ‘উইন-উইন’ সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
{{/usCountry}}পরিবেশ রক্ষার সঙ্গেও মানব উন্নয়নকে একই সূত্রে দেখেন আরএসএস প্রধান। তাঁর মতে, উন্নয়ন কখনও প্রকৃতিকে ধ্বংস করে হতে পারে না। বরং মানুষের অগ্রগতি এবং প্রকৃতির অগ্রগতি পরস্পরের পরিপূরক হওয়া উচিত। ‘গ্রিন সলিউশন’ বা পরিবেশবান্ধব সমাধানের মাধ্যমে মানুষের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি প্রকৃতিকেও রক্ষা করার কথা বলেন তিনি।
ভাগবত আরও বলেন, ব্যক্তি অধিকার ও সামাজিক দায়িত্ব, মানব উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ—এমন আপাতবিরোধী বিষয়গুলির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব। তাঁর মতে, এই সব কিছুকে যুক্ত করে যে মূল নীতি কাজ করে তা হল ‘অস্তিত্বের ঐক্য’। বিশ্বের সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত—এই ধারণাই ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন পথ দেখাতে পারে।
তিনি জানান, অতীতেও হিন্দু সভ্যতা এই দর্শনকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করেছে। এখন আধুনিক পরিস্থিতির উপযোগী নতুন মডেল তৈরি করে বিশ্বকে সেই চিন্তার ভিত্তিতে সমাধান দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
আরএসএসের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে বিদেশে সংগঠনের বিস্তৃত প্রচারের অংশ হিসেবেই লন্ডনে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘ ইউকে-র উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ব্রিটেনের তিন শতাধিক হিন্দু ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। নিউইয়র্ক ও টরন্টো সফরের পর তিন শহরব্যাপী শতবর্ষের প্রচার কর্মসূচির শেষ পর্বে লন্ডনে পৌঁছেছেন মোহন ভাগবত।