একটা দিন, একটা শপথ। আর সেই শপথের পর কেটে গিয়েছে টানা ২৫ বছর। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬-এর ৭ অক্টোবর এসে তার এক চতুর্থাংশ শতাব্দী পূর্ণ করলেন নরেন্দ্র মোদী। দেশের মুখ্যমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী—এই দুই সাংবিধানিক পদে টানা ২৫ বছর সরকারপ্রধান হিসেবে থাকার এই নজিরকে ঘিরে বুধবার দেশ জুড়ে চলছে নানা কর্মসূচি। আর সেই আবহেই মোদীর বার্তা—এত বছরে যে ‘পুঁজি’ তিনি অর্জন করেছেন, তা তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, দেশের মানুষের।
ভূমিকম্পের ধ্বংসস্তূপ থেকে দিল্লির মসনদ

মোদীর এই দীর্ঘ প্রশাসনিক পথচলার শুরু কিন্তু একেবারেই সহজ সময়ে হয়নি। ২০০১ সালে গুজরাতের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পরে রাজ্য পুনর্গঠন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেই সময় গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। তার পরের ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজ্য পরিচালনা করেন। কৃষি, সেচ, বিদ্যুৎ, পরিকাঠামো এবং বিনিয়োগকে ঘিরে গুজরাত মডেলকে সামনে রেখে নিজের রাজনৈতিক পরিচিতি আরও শক্ত করেন।
২০১৪ সালে গুজরাত থেকে দিল্লি। লোকসভা ভোটে বিজেপি-র সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন মোদী। তার পর ২০১৯ এবং ২০২৪—পর পর আরও দু’বার লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় ফেরে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট। ফলে ২৫ বছরের এই যাত্রায় এক দিকে রয়েছে গুজরাতে পর পর তিনটি বিধানসভা জয়, অন্য দিকে জাতীয় স্তরে পর পর তিনটি লোকসভা ম্যান্ডেট। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মতে, এই ধারাবাহিকতার নেপথ্যে রয়েছে মানুষের আস্থা।
‘জনবিশ্বাসই আসল পুঁজি’
২৫ বছরের মাইলফলকে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে ‘বিশ্বাস’-এর প্রসঙ্গ। মোদীর রাজনৈতিক বক্তব্যে বহু বার এসেছে, সরকারের আসল শক্তি মানুষের আস্থা। এ বারও সেই ভাবনাকেই সামনে রেখে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, দীর্ঘ জনজীবনে যে পুঁজি তৈরি হয়েছে, তা আসলে দেশের মানুষের বিশ্বাসের পুঁজি। অর্থাৎ ক্ষমতা বা পদ নয়, জনআস্থাকেই নিজের রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী।
এই জায়গাতেই গুজরাত থেকে দিল্লির প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার কথাও সামনে আনছে কেন্দ্রীয় সরকার। মন্ত্রিসভার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, গুজরাতে ব্যবহৃত অভিযোগ-নিষ্পত্তি ব্যবস্থা ‘স্বাগত’ পরবর্তী কালে কেন্দ্রীয় স্তরে ‘প্রগতি’-র মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থার অনুপ্রেরণা হয়েছে। গুজরাতের ‘জ্যোতিগ্রাম’ প্রকল্পের অভিজ্ঞতাও জাতীয় পরিসরে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে।
ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়
{{/usCountry}}এই জায়গাতেই গুজরাত থেকে দিল্লির প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার কথাও সামনে আনছে কেন্দ্রীয় সরকার। মন্ত্রিসভার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, গুজরাতে ব্যবহৃত অভিযোগ-নিষ্পত্তি ব্যবস্থা ‘স্বাগত’ পরবর্তী কালে কেন্দ্রীয় স্তরে ‘প্রগতি’-র মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থার অনুপ্রেরণা হয়েছে। গুজরাতের ‘জ্যোতিগ্রাম’ প্রকল্পের অভিজ্ঞতাও জাতীয় পরিসরে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে।
ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়
{{/usCountry}}মোদীর আত্মজীবনীসুলভ বক্তব্যে চন্দ্রযান মিশনের প্রসঙ্গও বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। তিনি বলেছেন, চন্দ্রযান তাঁকে শিখিয়েছে ব্যর্থতার পরেও কী ভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। মহাকাশ অভিযানের ক্ষেত্রে ভারতের প্রথম দিকের ধাক্কা যে শেষ কথা নয়, পরবর্তী সাফল্যই তার প্রমাণ—এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ ব্যর্থতাকে তিনি থেমে যাওয়ার কারণ নয়, আরও বড় লক্ষ্যে পৌঁছনোর প্রস্তুতি হিসাবে দেখছেন।
তার পর এল কোভিড। পৃথিবীর বহু দেশের মতো ভারতও অভূতপূর্ব এক মহামারির মুখোমুখি হয়েছিল। মোদীর বক্তব্যে করোনা-পর্বের শিক্ষা ছিল আরও আলাদা। এই সংকট তাঁকে দেশের ‘সমষ্টিগত চেতনা’ বা collective consciousness-এর গুরুত্ব বুঝিয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, অতিমারির মতো সঙ্কটে শুধু সরকারের সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়, দেশের মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা এবং অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সমালোচকদেরও ধন্যবাদ
২৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে প্রশংসার পাশাপাশি যে পরিমাণ সমালোচনা শুনতে হয়েছে, তা-ও ভুলে যাননি মোদী। বরং সমালোচকদের কাছ থেকেও শেখার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, যাঁরা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁরা তাঁকে বিনয় শিখিয়েছেন। যাঁরা তাঁকে নিচে নামানোর চেষ্টা করেছেন, তাঁরা শিখিয়েছেন কী ভাবে ফের উঠে দাঁড়াতে হয়। সমর্থকেরা দিয়েছেন উৎসাহ, আর সমালোচকেরা তাঁকে নিজের ভিতরের দিকে তাকাতে বাধ্য করেছেন। এই আত্মবিশ্লেষণের জায়গাটিকেই ২৫ বছরের অভিজ্ঞতার অন্যতম বড় শিক্ষা হিসাবে তুলে ধরেছেন তিনি।
এখানেই থামেনি তাঁর ফিরে দেখা। সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও আলাদা করে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথায়, মিষ্টি-তিক্ত নানা অভিজ্ঞতার মধ্যেও মিডিয়া তাঁকে সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে। রাজনৈতিক বিতর্ক, সমালোচনা কিংবা কঠিন প্রশ্ন—সবকিছুকেই নিজের পথচলার অংশ হিসাবেই দেখানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।
শৈশবের ‘শেখার আগ্রহ’ এখনও অটুট
অদ্ভুত ভাবে, ২৫ বছরের প্রশাসনিক সফরের মূল্যায়ন করতে গিয়ে মোদী ফিরে গিয়েছেন নিজের স্কুলজীবনেও। গুজরাতের ভাদনগরে স্কুলে তিনি নাকি প্রথম দিকেই পৌঁছে যেতেন। শিক্ষকের কাছ থেকে নতুন নতুন বিষয় শেখার সেই আগ্রহ এখনও বদলায়নি—এমনটাই জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আজও নিজেকে ‘শিক্ষার্থী’ বলেই মনে করেন তিনি, প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করেন।
এই শেখার ধারাই তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গেও জুড়ে দিলেন মোদী। ২৫ বছর পূর্তিকে তিনি শুধু অতীত স্মরণের দিন হিসাবে দেখতে নারাজ। বরং ভবিষ্যতের জন্য নতুন করে শপথ নেওয়ার দিন হিসাবেই দেখছেন। তাঁর লক্ষ্য ২০৪৭-এর বিকশিত ভারত। আর সেই লক্ষ্যে পৌঁছনোর সংকল্পে বার বার একটাই কথা বলেছেন—‘আমরা পারব, আমরা করব।’
তাই ২৫ বছরের মোদীর আত্মমূল্যায়নে সবচেয়ে বেশি যে শব্দটি ফিরে এল, তা ‘সাফল্য’ নয়, ‘শিক্ষা’। ভূমিকম্প তাঁকে দিয়েছে পুনর্গঠনের পাঠ, চন্দ্রযান শিখিয়েছে ব্যর্থতার পর ঘুরে দাঁড়াতে, কোভিড বুঝিয়েছে মানুষের সম্মিলিত শক্তির গুরুত্ব, আর সমালোচনা শিখিয়েছে আত্মসমীক্ষা। সেই অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়েই আগামী দিনের ভারতের দিকে তাকাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী—এই ছিল বুধবারের বার্তার মূল সুর।