হিমালয়ের বুকে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় শুধু নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকেই তছনছ করেনি, নেপাল-চিন বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার গিরং সীমান্তবন্দরকেও কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। ২৬ অগস্ট হিমবাহ ও পাথরের বিশাল ধসের পর জল, কাদা ও পাথরের প্রবল স্রোত নেপালের রসুয়া অঞ্চল হয়ে চিনের তিব্বতের গিরং পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ৬ সেপ্টেম্বরের হিসাবে তিব্বতের দিকে ৪৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত এবং ৫১৯ জন নিখোঁজ ছিলেন; দুই দেশের মিলিত হিসাবে মৃতের সংখ্যা ১,৩০০ ছাড়িয়েছে এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৫,০০০-এর বেশি।

গিরং বন্দরের বর্তমান চেহারা বিপর্যয়ের মাত্রা স্পষ্ট করে। একসময়ের ব্যস্ত সীমান্তকেন্দ্রে এখন কাদা, পাথর, ধ্বংসাবশেষ আর ছিন্নভিন্ন পরিকাঠামো। রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্দরের পাঁচতলা কাস্টমস ভবনের আর কোনও চিহ্ন প্রায় নেই। যেখানে প্রায় ২০ মিটার উঁচু সীমান্ত-ফটক ছিল, সেখানেও শুধু ধ্বংসস্তূপ। উদ্ধারকারীরা খননযন্ত্র, কোদাল এবং মাটির নীচে বস্তু শনাক্ত করার রাডার ব্যবহার করে নিখোঁজদের খুঁজছেন।
গিরং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে নেপাল-চিন বাণিজ্যে। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের পর তিব্বতের সঙ্গে নেপালের পূর্বদিকের ঝাংমু-কোদারি রুট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে গিরং-রাসুওয়াগাধি করিডর আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালে গিরং বন্দর দিয়ে ৪.২৫ বিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ৬০৪ মিলিয়ন ডলারের আমদানি-রফতানি হয়েছিল, যা ওই সময় মোট চিন-নেপাল বাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ এই একটি স্থলবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়া শুধু সীমান্ত বাণিজ্য নয়, নেপালের সরবরাহ ব্যবস্থা, স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানেও বড় ধাক্কা।
এই রুটের আরও একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কৈলাস-মানসসরোবর যাত্রায় তিব্বতে যাতায়াতকারী তীর্থযাত্রীদের জন্যও গিরং গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ছিল। রয়টার্স জানিয়েছে, তিব্বতে নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে বহু ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন; ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৯ জন ভারতীয় নিখোঁজের কথা বলা হয়। ফলে বিপর্যয়টির প্রভাব বাণিজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে পর্যটন ও তীর্থযাত্রাতেও পড়েছে।
{{/usCountry}}এই রুটের আরও একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কৈলাস-মানসসরোবর যাত্রায় তিব্বতে যাতায়াতকারী তীর্থযাত্রীদের জন্যও গিরং গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ছিল। রয়টার্স জানিয়েছে, তিব্বতে নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে বহু ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন; ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৯ জন ভারতীয় নিখোঁজের কথা বলা হয়। ফলে বিপর্যয়টির প্রভাব বাণিজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে পর্যটন ও তীর্থযাত্রাতেও পড়েছে।
{{/usCountry}}তবে গিরংয়ের ধ্বংসের চেয়েও বড় প্রশ্ন উঠছে বহু আলোচিত চিন-নেপাল রেল প্রকল্প নিয়ে। ২০১৬ সালে চিন তিব্বত থেকে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু পর্যন্ত রেল সংযোগের পরিকল্পনা সামনে আনে। পরে এটি বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই-এর ট্রান্স-হিমালয়ান মাল্টি-ডাইমেনশনাল কানেক্টিভিটি নেটওয়ার্কের অংশ হয়। প্রস্তাবিত রেলপথ চিনের শিগাতসে থেকে গিরং হয়ে নেপালের রাসুওয়া পেরিয়ে কাঠমান্ডুতে পৌঁছনোর কথা। নেপালি অংশটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭২ কিলোমিটার।
প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় সমস্যা অবশ্য নতুন নয়। চিনা প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, নেপালের এই ৭২.২৫ কিলোমিটার অংশের প্রায় ৯৮.৫ শতাংশই সেতু বা সুড়ঙ্গের মাধ্যমে নির্মাণ করতে হতে পারে। অর্থাৎ এটি কোনও সাধারণ সমতলভূমির রেললাইন নয়। খাড়া ঢাল, সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চল, ভূমিকম্পের ঝুঁকি, হিমবাহ, নদীখাত এবং পাহাড়ধস—সবকিছুর মধ্য দিয়ে এই রেলপথ তৈরি করতে হবে। প্রকল্পটির নেপালি অংশের প্রাক্-সম্ভাব্যতা ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২.৭৫ বিলিয়ন ডলার।
এখানেই সাম্প্রতিক বন্যা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ২৬ অগস্টের বিপর্যয় সরাসরি প্রমাণ করে না যে প্রস্তাবিত রেললাইন নির্মাণ করলেই এমন দুর্যোগ ঘটবে। বরং বিশেষজ্ঞদের মূল উদ্বেগ হল—এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ঝুঁকি কতটা গভীরভাবে হিসাব করে এমন বিশাল প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদি একটি আকস্মিক হিমবাহধস কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাস্তা, সেতু, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তবন্দরকে কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের রেল সুড়ঙ্গ, উঁচু সেতু ও পাহাড় কেটে তৈরি ট্র্যাকের জন্য ঝুঁকি-পরিকল্পনা কতটা বাস্তবসম্মত—সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
চিন-নেপাল রেল প্রকল্প বাস্তবে এখনও নির্মাণ পর্যায়ে পৌঁছয়নি। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছিল, বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা তখনও চূড়ান্ত হয়নি। চূড়ান্ত রুট, মোট খরচ এবং নির্মাণের অর্থায়নও স্থির হয়নি। অর্থাৎ বহু বছর ধরে আলোচনায় থাকা প্রকল্পটি এখনও মূলত সমীক্ষা, পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তিগত মূল্যায়নের স্তরেই রয়েছে।
বন্যার পর তাই প্রকল্পটির পরিবেশগত মূল্যায়ন নতুন করে করার দাবি জোরালো হতে পারে। নেপাল ও চিনের বিশেষজ্ঞরা উচ্চঝুঁকির হিমবাহ-হ্রদগুলির জন্য স্বয়ংক্রিয় ও রিয়েল-টাইম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আন্তঃসীমান্ত জলবিদ্যাগত সমীক্ষা এবং আরও শক্তিশালী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। চিনা সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অঞ্চলে ৩,০০০-এরও বেশি হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে, যার মধ্যে ১৮৭টিকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভারতের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। হিমালয়ের উজানে যে কোনও বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব শুধু সেই দেশের সীমানায় আটকে থাকে না। নেপাল ও তিব্বতের নদী অববাহিকার একাধিক জলপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত ভারতের দিকে নেমে আসে। ফলে হিমবাহধস, ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা বা বড় জলাধার-সংক্রান্ত দুর্ঘটনার প্রভাব নিম্নপ্রবাহে ভারতের উত্তরাঞ্চলেও পৌঁছতে পারে। এই কারণেই আন্তঃসীমান্ত জলবিদ্যা, তথ্য আদানপ্রদান এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা ভারতের কাছেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নেপালের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ মডেলের সঙ্গে এখানে একটি উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও রয়েছে। ভারত ও নেপাল ইতিমধ্যেই একাধিক আন্তঃসীমান্ত রেল সংযোগ বাস্তবায়ন করছে। জুন ২০২৬-এর সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জয়নগর-বিজলপুরা-বর্ধিবাস এবং জোগবনি-বিরাটনগর ব্রডগেজ সংযোগের কাজ এগোচ্ছে; রক্সৌল-কাঠমান্ডু রেলপথের ফাইনাল লোকেশন সার্ভে নিয়েও দুই দেশ আলোচনা করেছে। এই প্রকল্পগুলির উন্নয়নে ভারত অনুদানভিত্তিক সহায়তা দিচ্ছে।
এদিকে বন্যার আর্থিক ক্ষতিও বিপুল। নেপালের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বাড়িঘর, সম্পত্তি ও পরিকাঠামো মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ৩৮৭.৫ বিলিয়ন নেপালি রুপি বা প্রায় ২.৫৬ বিলিয়ন ডলার। প্রায় ২০ হাজার বাড়ি পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে নেপালের জলবায়ু ক্ষতিপূরণ দাবির প্রসঙ্গও সামনে এসেছে। বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল ভারত, চিন ও আমেরিকার মতো বড় নির্গমনকারী দেশগুলির কাছ থেকে জলবায়ু-সংক্রান্ত সহায়তা বা ক্ষতিপূরণের কথা বলেছিলেন। পরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়। ভারত স্পষ্ট জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন একটি যৌথ বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং নেপালের পুনর্গঠন ও উদ্ধারকাজে ভারত সাহায্য অব্যাহত রাখবে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। হিমালয়ের মতো ভঙ্গুর ভূপ্রকৃতিতে শুধু রাস্তা, রেললাইন, সুড়ঙ্গ, সেতু বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের আর্থিক লাভ হিসাব করলেই চলবে না। প্রকল্পের নকশার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে হিমবাহ, নদী, পাহাড়ধস, ভূমিকম্প এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি। গিরং বন্দরের ধ্বংস তাই কেবল একটি সীমান্তবন্দর হারানোর ঘটনা নয়; এটি চিন-নেপাল সংযোগের পুরো মডেলকেই নতুন করে যাচাই করার সতর্কবার্তা।
কাঠমান্ডু-গিরং রেলপথ আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পরে একটি বিষয় স্পষ্ট—হিমালয়ের বুকে ‘মেগা কানেক্টিভিটি’র স্বপ্ন যত বড় হবে, পরিবেশগত ও দুর্যোগ-নিরাপত্তার পরীক্ষাটিও তত কঠিন হবে। আর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে প্রকল্প এগিয়ে গেলে তার মূল্য দিতে হতে পারে শুধু নেপাল বা চিনকে নয়, গোটা হিমালয়-অঞ্চলকেই।