ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর এবার জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবি তুলল নেপাল। গত সপ্তাহের ভয়াবহ দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন দাবি সামনে আনছে কাঠমান্ডু।

নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, এই দুর্যোগের জন্য নেপাল দায়ী নয়। অথচ বিশ্ব উষ্ণায়নের ভয়াবহ প্রভাব সবচেয়ে বেশি ভোগ করতে হচ্ছে তাদের মতো দেশকেই। তাঁর অভিযোগ, নেপাল থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন অত্যন্ত কম। তবুও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দ্রুত হিমবাহ গলছে। বাড়ছে পাহাড়ি বিপর্যয়ের ঝুঁকি।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খানাল বলেন, নেপাল এমন একটি বৈশ্বিক সংকটের চরম মূল্য দিচ্ছে, যে সংকট তারা তৈরি করেনি। তাঁর মতে, দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়া এবং ভয়াবহ পাহাড়ি বন্যা জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ফল।
নেপালের বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্য, দুর্যোগের পর দেশটিকে যে সাহায্য দেওয়া হবে, সেটিকে দান হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি নৈতিক দায় হিসেবে দেখা দরকার। তাঁর মতে, নেপালের বিদেশনীতি এবার ‘সাহায্য নেওয়া’ থেকে ‘ন্যায় ও ক্ষতিপূরণ’-এর দিকে এগোবে।
এই প্রসঙ্গে ভারত, চিন এবং আমেরিকার নামও তুলেছেন খানাল। তাঁর দাবি, বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলির মধ্যে রয়েছে এই তিন দেশ। তাই তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে নেপালের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলিকে সহায়তা করার।
ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৫ সালের নির্গমন সংক্রান্ত প্রতিবেদনে অবশ্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় নির্গমনকারী দেশের তালিকায় চিন, আমেরিকা, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার নাম রয়েছে। এই দেশগুলি সম্মিলিতভাবে বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৬১.৮ শতাংশের জন্য দায়ী। একই সঙ্গে বিশ্বের জনসংখ্যা এবং অর্থনীতিরও বড় অংশ এই দেশগুলির হাতে।
{{/usCountry}}ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৫ সালের নির্গমন সংক্রান্ত প্রতিবেদনে অবশ্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় নির্গমনকারী দেশের তালিকায় চিন, আমেরিকা, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার নাম রয়েছে। এই দেশগুলি সম্মিলিতভাবে বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ৬১.৮ শতাংশের জন্য দায়ী। একই সঙ্গে বিশ্বের জনসংখ্যা এবং অর্থনীতিরও বড় অংশ এই দেশগুলির হাতে।
{{/usCountry}}প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত কয়েক দশকে চিনের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন চার গুণেরও বেশি বেড়েছে। ভারতের নির্গমনও প্রায় তিন গুণ হয়েছে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলির দ্রুত শিল্পায়ন নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে ভারতের অবস্থান কিছুটা আলাদা। নয়াদিল্লি বারবার জলবায়ু ন্যায়বিচারের কথা বলেছে। ভারতের বক্তব্য, দেশের মাথাপিছু কার্বন নির্গমন এখনও তুলনামূলকভাবে কম। তাই জলবায়ু সংক্রান্ত দায়িত্ব নির্ধারণের সময় কোনও দেশের ঐতিহাসিক নির্গমন, উন্নয়নের প্রয়োজন এবং আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করা উচিত।
ভারত আরও দাবি করেছে, পশ্চিমা দেশগুলি বহু আগেই শিল্পায়নের পথে এগিয়েছে। ফলে অতীতে বিশ্ব কার্বন বাজেটের বড় অংশ তারাই ব্যবহার করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলির জলবায়ু মোকাবিলায় ধনী দেশগুলিকে প্রয়োজনীয় অর্থ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে বলেও ভারত দাবি করে এসেছে।
নেপালের জলবায়ু ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদেরও একই বক্তব্য। তাঁদের মতে, নেপালের মতো দেশ সামান্য নির্গমন করেও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ ফল ভোগ করছে। তাই শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা এবং আরও ভালো পরিকল্পনাও প্রয়োজন।
নেপালি জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মঞ্জিত ঢাকাল বলেছেন, বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্যাসের ০.১ শতাংশেরও কম নেপাল থেকে নির্গত হয়। অথচ দেশটি এখন ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয়ের মুখে। নেপালের সাম্প্রতিক বন্যা তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি নতুন করে সামনে আনছে জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। কারা দূষণ করছে, আর কারা তার মূল্য দিচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে।