Earth freshwater locked in one place: জলসংকটে ভুগতে থাকা এই পৃথিবীর বুকে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লুকিয়ে রয়েছে। নীল গ্রহ হিসেবে পরিচিত আমাদের এই পৃথিবীর চারভাগের তিনভাগই জলে ঘেরা হলেও, মানুষের ব্যবহারের উপযোগী মিষ্টি জলের পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পৃথিবীর সমগ্র মিষ্টি জলের প্রায় ৬৫ শতাংশের বেশি অংশ লুকিয়ে রয়েছে এমন একটি নির্দিষ্ট দুর্গম জায়গায়, যা মানুষ কোনোভাবেই ছুঁতে বা ব্যবহার করতে পারবে না। প্রকৃতির এই রহস্যময় সঞ্চয়ভাণ্ডার সম্পর্কে জেনে নিন।

জলই জীবন। তবে পৃথিবীর মোট জলের প্রায় ৯৭ শতাংশই হলো সমুদ্রের নোনতা জল, যা পানের অযোগ্য। বাকি মাত্র ৩ শতাংশ হলো মিষ্টি জল বা ফ্রেশওয়াটার (Freshwater), যার ওপর নির্ভর করে বেঁচে রয়েছে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ, পশুপাখি এবং উদ্ভিদ। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য। এই অমূল্য ৩ শতাংশ মিষ্টি জলের সিংহভাগ, অর্থাৎ প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ অংশই মানুষের তৈরি কোনো আধুনিক প্রযুক্তির নাগালের বাইরে। আর এই বিশাল জলের ভাণ্ডারটি জমা হয়ে রয়েছে অ্যান্টার্কটিকার (Antarctica) বরফের চাদরের নিচে।
অ্যান্টার্কটিকার বরফের সাম্রাজ্য ও মিষ্টি জলের রহস্য
অ্যান্টার্কটিকা হলো পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত এক বিস্তীর্ণ বরফাবৃত মহাদেশ। বিজ্ঞানীরা জানান, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তুষারপাতের ফলে এই মহাদেশের ওপর মাইলের পর মাইল পুরু বরফের আস্তরণ বা আইস শিট (Ice Sheets) তৈরি হয়েছে। এই বরফ কিন্তু সমুদ্রের নোনতা জল দিয়ে তৈরি নয়, এটি সম্পূর্ণ খাঁটি ও বিশুদ্ধ মিষ্টি জল। পৃথিবীর বৃহত্তম এই ফ্রেশওয়াটার ইকোসিস্টেমটি হিমায়িত অবস্থায় বন্দি হয়ে রয়েছে। যদি কোনোদিন এই সমস্ত বরফ গলে যায়, তবে পৃথিবীর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৬০ মিটার বা ২০০ ফুটের বেশি বেড়ে যাবে, যা বিশ্বের অধিকাংশ উপকূলবর্তী শহরকে চিরতরে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
মানুষ কেন এই জল ব্যবহার করতে পারছে না?
হাতের নাগালে এত বড় বিশুদ্ধ জলের উৎস থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন তা তৃষ্ণা মেটাতে ব্যবহার করতে পারছে না, তার পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণ রয়েছে:
১. চরম ভৌগোলিক দুর্গমতা:
{{/usCountry}}হাতের নাগালে এত বড় বিশুদ্ধ জলের উৎস থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন তা তৃষ্ণা মেটাতে ব্যবহার করতে পারছে না, তার পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণ রয়েছে:
১. চরম ভৌগোলিক দুর্গমতা:
{{/usCountry}}অ্যান্টার্কটিকা পৃথিবীর সবচেয়ে ঠান্ডা, শুষ্ক এবং ঝড়প্রবণ এলাকা। এখানকার তাপমাত্রা প্রায়শই মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে। এই চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় কোনো স্থায়ী মানব বসতি বা জলের বড় কারখানা গড়ে তোলা বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব।
২. পরিবহনের বিপুল খরচ ও লজিস্টিকস সমস্যা:
যদি কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই বরফ গলিয়ে জল তৈরিও করা হয়, তবে অ্যান্টার্কটিকা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত মানবসভ্যতার মূল ভূখণ্ডে সেই জল ট্যাঙ্কারে করে পরিবহন করা অর্থনৈতিকভাবে কোনোভাবেই লাভজনক নয়। এই জলের দাম সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যাবে।
৩. পরিবেশগত আন্তর্জাতিক আইন:
অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশটি 'অ্যান্টার্কটিক চুক্তি' (Antarctic Treaty)-র মাধ্যমে সংরক্ষিত। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশ বা সংস্থা বাণিজ্যিক স্বার্থে বা খনিজ উত্তোলনের জন্য এখানকার প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি করতে পারবে না। ফলে এই বরফকে গলিয়ে জল তৈরি করার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের মস্ত বড় হুমকি
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের (Global Warming) কারণে অ্যান্টার্কটিকার এই প্রাচীন বরফের চাদর এখন দ্রুত গলতে শুরু করেছে। মানুষের নাগালের বাইরে থাকা এই মিষ্টি জল পানের কাজে লাগার পরিবর্তে সরাসরি সমুদ্রের নোনতা জলের সাথে মিশে যাচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রের জলের উচ্চতা বাড়ছে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যা ও মিষ্টি জলের সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
অ্যান্টার্কটিকার হিমবাহে বন্দি এই ৬৫ শতাংশ মিষ্টি জল আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির সম্পদ অসীম হলেও মানুষের জন্য তা কতটা সীমিত। তাই মাটির নিচের বা নদীর জলকে অপচয় না করে, আজ থেকেই জল সংরক্ষণে সচেতন হওয়াই মানবজাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায়।