বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্বে ফিরছে পাকিস্তান! এমনই দাবি করেছে ইসলামাবাদ। আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডার (আইএমএফ) এবং বিশ্ব ব্যাঙ্কের গভর্নরস বোর্ডের ২০২৭ সালের বার্ষিক বৈঠকের সভাপতিত্ব করার দায়িত্ব পেয়েছে পাকিস্তান। ১৯৫৩ সালের পর এই প্রথম ওই দায়িত্ব পাচ্ছে দেশটি। ঘটনাটিকে ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ বলে বর্ণনা করেছে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রক। কিন্তু ইসলামাবাদের এই দাবির সঙ্গে একমত নন আন্তর্জাতিক অর্থ ভান্ডারের ভারতের প্রাক্তন কার্যনির্বাহী অধিকর্তা কৃষ্ণমূর্তি ভি সুব্রহ্মণ্যন। তাঁর বক্তব্য, এই পদ কোনও ক্ষমতাশালী নেতৃত্বের আসন নয়। বরং এটি বার্ষিক বৈঠকের সভাপতিত্ব করার একটি আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব, যা সদস্য দেশগুলির মধ্যে নিয়মিত ঘুরে ঘুরে আসে।
‘ক্ষমতা নয়, নিছক প্রথা’

সমাজমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট করে পাকিস্তানের দাবির জবাব দিয়েছেন সুব্রহ্মণ্যন। তাঁর বক্তব্য, ২০২৭ সালে আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাঙ্কের বার্ষিক বৈঠকে সভাপতিত্ব করবে পাকিস্তান। কিন্তু সেই পদ মূলত আনুষ্ঠানিক। প্রতি বছরই এই দায়িত্ব অন্য কোনও দেশের হাতে যায়। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি জানান, ২০২৬ সালে এই দায়িত্বে রয়েছে প্যারাগুয়ে। তার আগে ২০২৫ সালে দায়িত্ব সামলেছে কেপ ভার্দে।
সুব্রহ্মণ্যনের মতে, এই দায়িত্বকে বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে ফিরে আসা বলে প্রচার করা ঠিক নয়। তাঁর কথায়, এটি মূলত প্রোটোকল মেনে বৈঠক পরিচালনার দায়িত্ব, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর একচ্ছত্র ক্ষমতা পাওয়ার ঘটনা নয়।
ভারতের জি২০ সভাপতিত্ব এবং ব্রিকসের নেতৃত্বের সঙ্গে পাকিস্তানের এই দায়িত্বের তুলনা করাও ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তাঁর ব্যাখ্যা, ভারতের জি২০ সভাপতিত্বে বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলির আলোচনার কর্মসূচি নির্ধারণের সুযোগ ছিল। ব্রিকসের সভাপতিত্বের ক্ষেত্রেও উদীয়মান অর্থনীতিগুলির মঞ্চে আলোচনার দিশা নির্ধারণের গুরুত্ব ছিল। অন্য দিকে, আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাঙ্কের বার্ষিক বৈঠকে সভাপতিত্ব করার দায়িত্বের পরিধি অনেক সীমিত।
আইএমএফের ঋণের উপরেই নির্ভরতা পাকিস্তানের
পাকিস্তানের এই নতুন দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে আরও একটি কারণে। এক দিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার দাবি, অন্য দিকে আর্থিক সঙ্কট সামলাতে আইএমএফের সাহায্যের উপর নির্ভরতা। বর্তমানে পাকিস্তান আইএমএফের ৭০০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। পাশাপাশি জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বাড়াতে ১৪০ কোটি ডলারের আর একটি কর্মসূচিও চলছে।
{{/usCountry}}পাকিস্তানের এই নতুন দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে আরও একটি কারণে। এক দিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার দাবি, অন্য দিকে আর্থিক সঙ্কট সামলাতে আইএমএফের সাহায্যের উপর নির্ভরতা। বর্তমানে পাকিস্তান আইএমএফের ৭০০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। পাশাপাশি জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলা এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বাড়াতে ১৪০ কোটি ডলারের আর একটি কর্মসূচিও চলছে।
{{/usCountry}}সম্প্রতি ওই দুই ঋণ কর্মসূচির পর্যালোচনা নিয়ে আইএমএফের আধিকারিকদের সঙ্গে পাকিস্তানের সমঝোতা হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে আরও প্রায় ১২০ কোটি ডলার পেতে পারে ইসলামাবাদ। তবে সেই অর্থ ছাড়ের বিষয়টি আইএমএফের কার্যনির্বাহী বোর্ডের অনুমোদনের উপর নির্ভরশীল।
এই পরিস্থিতিতে আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাঙ্কের বার্ষিক বৈঠকের সভাপতিত্বের দায়িত্ব পাওয়াকে বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে পাকিস্তান সরকার। তাদের বক্তব্য, এর ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও উন্নয়ন সংক্রান্ত আলোচনায় পাকিস্তান আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারবে। সদস্য দেশগুলির মধ্যে আলোচনা এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এই দায়িত্ব গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করবে।
দায়িত্ব পাওয়া আর ক্ষমতা পাওয়া এক নয়
সুব্রহ্মণ্যনের বক্তব্যের মূল কথা, কোনও আন্তর্জাতিক বৈঠকের সভাপতি হওয়া আর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা হাতে পাওয়া এক বিষয় নয়। আইএমএফ বা বিশ্ব ব্যাঙ্কের ঋণনীতি, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কিংবা সদস্য দেশগুলির জন্য আর্থিক সহায়তার শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা শুধু বার্ষিক বৈঠকের সভাপতির হাতে থাকে না।
তাই ২০২৭ সালে পাকিস্তান এই দায়িত্ব পেলেও তা দিয়ে দেশটির আর্থিক পরিস্থিতি বা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না। বরং দেশের আর্থিক সংস্কার, ঋণের বোঝা সামলানো, বিদেশি মুদ্রার জোগান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা বাড়ে, সেগুলিই হবে প্রকৃত মাপকাঠি।
সব মিলিয়ে, ১৯৫৩ সালের পর ফের এই দায়িত্ব পাওয়া পাকিস্তানের জন্য অবশ্যই একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কিন্তু এটিকে বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখার বিরোধিতা করেছেন ভারতের প্রাক্তন আইএমএফ অধিকর্তা। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক মঞ্চে দায়িত্ব পাওয়া এবং আর্থিক সিদ্ধান্তে প্রকৃত ক্ষমতা অর্জনের মধ্যে ফারাক রয়েছে।