একদিকে কথায় কথায় ভারতের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি, অন্যদিকে এখন সেই ভারতের কাছেই সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ‘গঠনমূলক’ আলোচনার আবেদন করছে পাকিস্তান। সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বাড়তে থাকা টানাপড়েনের মধ্যে ইসলামাবাদের সাম্প্রতিক অবস্থানকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক।
বুধবার পাকিস্তান প্রকাশ্যে ভারতকে সিন্ধু জলচুক্তির কাঠামোর মধ্যে ‘গঠনমূলকভাবে’ আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছে। পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবির বক্তব্য, ইসলামাবাদ এখনও চুক্তিটি ‘অক্ষরে অক্ষরে’ মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ভারতকেও একই মনোভাব দেখাতে হবে।
পাকিস্তানের বক্তব্য, হেগের সালিশি আদালত বা কোর্ট অব আরবিট্রেশন তাদের অবস্থানকে সমর্থন করেছে এবং সিন্ধু জলচুক্তি এখনও কার্যকর ও বাধ্যতামূলক। সেই রায়ের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য পাকিস্তান সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে বলেও জানিয়েছেন আন্দ্রাবি। একই সঙ্গে ভারতের কাছে ফের চুক্তির ‘আইনি কাঠামো’ মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামাবাদ।
কিন্তু পাকিস্তানের এই আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে নয়াদিল্লি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা তথাকথিত কোর্ট অব আরবিট্রেশনের আইনি অস্তিত্বই স্বীকার করে না। ভারতের বক্তব্য, ওই আদালত এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের উপর তার কোনও কর্তৃত্ব থাকতে পারে না। ফলে আদালতের কোনও রায় বা ভবিষ্যতের কোনও সিদ্ধান্ত ভারতের পদক্ষেপকে প্রভাবিত করবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার ভারতের সিদ্ধান্ত এখনও বহাল রয়েছে। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, চুক্তিকে ‘অ্যাবেয়ান্স’-এ রাখার সিদ্ধান্তে কোনও পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ পাকিস্তান আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের কথা তুলে ধরে যে চাপ তৈরি করতে চাইছে, ভারত আপাতত তা মানতে নারাজ।
{{/usCountry}}সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার ভারতের সিদ্ধান্ত এখনও বহাল রয়েছে। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, চুক্তিকে ‘অ্যাবেয়ান্স’-এ রাখার সিদ্ধান্তে কোনও পরিবর্তন হয়নি। অর্থাৎ পাকিস্তান আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের কথা তুলে ধরে যে চাপ তৈরি করতে চাইছে, ভারত আপাতত তা মানতে নারাজ।
{{/usCountry}}সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে বর্তমান সংঘাতের সূত্রপাত গত বছরের এপ্রিলের পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পর। ওই হামলায় ২৬ জন সাধারণ মানুষ নিহত হওয়ার পর ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর থেকেই দুই দেশের মধ্যে জলবণ্টন ও চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে পাকিস্তান হেগের কোর্ট অব আরবিট্রেশনের দ্বারস্থ হয়। লক্ষ্য ছিল, ভারত চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না এবং চুক্তির বর্তমান আইনি অবস্থান কী—সেই বিষয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত আদায় করা। আদালতের রায়কে পাকিস্তান স্বাগত জানালেও ভারত গোটা প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ফলে বর্তমানে দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। পাকিস্তান বলছে, চুক্তি এখনও কার্যকর এবং ভারতকে আলোচনার মাধ্যমে তা মেনে চলতে হবে। ভারত বলছে, যে আদালতের রায়কে পাকিস্তান সামনে আনছে, তার কোনও এখতিয়ারই নেই এবং সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত এখনও কার্যকর।
এই পরিস্থিতিতেই পাকিস্তানের ‘গঠনমূলক আলোচনার’ আহ্বান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি ও পরমাণু হামলার হুমকি দিতে অভ্যস্ত পাকিস্তানের কূটনৈতিক সুর এখন অনেকটাই নরম। জলচুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা ছাড়া এগোনো কঠিন—এই বাস্তবতা ইসলামাবাদও বুঝতে পারছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক মহলের একাংশ।
অর্থাৎ, মুখে যুদ্ধের হুঙ্কার থাকলেও বাস্তবের মাটিতে সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ভারতের সঙ্গে কথা বলার দরজা খোলা রাখতেই চাইছে পাকিস্তান। এখন প্রশ্ন, নয়াদিল্লি কি ইসলামাবাদের এই আবেদনে সাড়া দেবে, নাকি চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তেই অনড় থাকবে?