Vestigial organs in humans: মানুষের শরীরের বিবর্তন এক অন্তহীন বিস্ময়ের আকর। আমাদের চোখের কোণে লালচে মাংসল যে ছোট অংশটি দেখা যায়, সেটি আসলে বিবর্তনের এক অবশিষ্টাংশ বা 'Vestigial Organ'। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্লিকা সেমিলুনারিস (Plica Semilunaris)। এটি একসময় আমাদের চোখের তৃতীয় পাতা বা নিকটিটেটিং মেমব্রেন (Nictitating Membrane) ছিল।

মানুষের চোখের ভেতরের কোণে (নাকের দিকে) তাকালে একটি ছোট গোলাপী বা লালচে ভাঁজ দেখা যায়। আয়নায় হয়তো অনেকবার দেখেছেন, কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন এটি কী? আধুনিক বিজ্ঞানের মতে, এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের চোখের সেই তৃতীয় পাতা, যা সময়ের সাথে সাথে অকেজো হয়ে সংকুচিত হয়ে গেছে। আজ আমাদের কাছে এটি কেবল একটি অঙ্গের অবশিষ্টাংশ হলেও, বিবর্তনের ইতিহাসে এর ভূমিকা ছিল অসামান্য।
প্লিকা সেমিলুনারিস আসলে কী কাজে লাগত?
নিকটিটেটিং মেমব্রেন বা এই তৃতীয় পাতাটি মূলত একটি স্বচ্ছ বা অর্ধস্বচ্ছ পর্দা ছিল। এটি চোখের ওপর আড়াআড়িভাবে (Horizontally) ওঠানামা করতে পারত। এর প্রধান কাজ ছিল তিনটি:
১. সুরক্ষা: ধুলোবালি, বালু বা জলের নিচে তীব্র প্রবাহ থেকে চোখকে রক্ষা করা।
২. আর্দ্রতা বজায় রাখা: চোখের মণি বা কর্নিয়াকে শুকিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে এটি চোখের ওপর অশ্রুর প্রলেপ বুলিয়ে দিত।
৩. পরিষ্কার রাখা: চোখের উপরিভাগে জমে থাকা ময়লা ঝাড়ুদারের মতো পরিষ্কার করে দিত।
কোন কোন প্রাণীর এখনও এটি কাজে লাগে?
{{/usCountry}}৩. পরিষ্কার রাখা: চোখের উপরিভাগে জমে থাকা ময়লা ঝাড়ুদারের মতো পরিষ্কার করে দিত।
কোন কোন প্রাণীর এখনও এটি কাজে লাগে?
{{/usCountry}}মানুষের ক্ষেত্রে এটি অকেজো হয়ে গেলেও অনেক প্রাণীর জীবনে এটি আজও অপরিহার্য।
- পাখি: বিশেষ করে বাজপাখি বা ঈগলের মতো শিকারি পাখিদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত জরুরি। দ্রুত উড়ন্ত অবস্থায় বাতাসের ঝাপটা থেকে চোখ বাঁচাতে তারা এটি ব্যবহার করে।
- সরীসৃপ ও উভচর: কুমির বা ব্যাঙের ক্ষেত্রে এটি জলের নিচে ‘গগলস’-এর মতো কাজ করে। তারা জলের নিচেও স্বচ্ছভাবে দেখতে পায় এবং চোখ ভিজে থাকে।
- স্তন্যপায়ী: বিড়াল, কুকুর বা মেরু ভালুকের চোখেও এটি দেখা যায়। মরুভূমির উট বালুঝড় থেকে বাঁচতে এই পর্দা ব্যবহার করে।
বিবর্তনের কারণে এটি হারিয়ে গেল কেন?
প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি এটি এতই উপকারী হতো, তবে মানুষের চোখ থেকে কেন এটি হারিয়ে গেল? এর পেছনে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের কয়েকটি যুক্তি রয়েছে:
১. বাসস্থানের পরিবর্তন: আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন ঘন বন বা জলের কাছাকাছি পরিবেশ ছেড়ে অপেক্ষাকৃত কম ধুলোবালির পরিবেশে অভ্যস্ত হতে শুরু করল, তখন এই পর্দার প্রয়োজনীয়তা কমতে থাকে।
২. দৃষ্টিশক্তির ধরণ: মানুষের দুই চোখের দৃষ্টির সমন্বয় বা 'Binocular Vision' অত্যন্ত উন্নত। তৃতীয় পর্দাটি বারবার চোখের ওপর দিয়ে যাতায়াত করলে দৃষ্টিশক্তির সূক্ষ্মতা ব্যাহত হতে পারত।
৩. হাত ও চোখের পাতার উন্নতি: মানুষের হাতের আঙুল অত্যন্ত দক্ষ এবং আমাদের ওপর ও নিচের চোখের পাতা অত্যন্ত দ্রুত কাজ করে। হাত দিয়ে ঘষে চোখ পরিষ্কার করার সক্ষমতা আসার পর এই স্বয়ংক্রিয় পর্দার গুরুত্ব হারিয়ে যায়।
প্রকৃতি কোনো অপ্রয়োজনীয় অঙ্গকে পুষ্ট করতে শক্তি অপচয় করে না (Natural Selection)। তাই ব্যবহারের অভাবে এটি ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে আজ কেবল একটি ছোট ভাঁজ বা ‘প্লিকা সেমিলুনারিস’-এ পরিণত হয়েছে।
প্লিকা সেমিলুনারিস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা আকাশচারী পাখি বা জলচর প্রাণীদের মতোই এক সাধারণ উৎস থেকে বিবর্তিত হয়েছি। আমাদের চোখের কোণে লুকিয়ে থাকা এই ছোট্ট অংশটি আসলে কয়েক লক্ষ বছরের বিবর্তনের এক জীবন্ত স্বাক্ষর।