রাফাল যুদ্ধবিমান নিয়ে ভারত ফ্রান্সের মধ্যে চলতে থাকা আলোচনায় এবার সামনে এল প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার বড় প্রশ্ন। ১১৪টি রাফাল কেনার প্রস্তাবিত চুক্তিতে ভারতীয় বায়ুসেনা এমন একটি প্রযুক্তিগত সুবিধা চাইছে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে নিজেদের তৈরি অস্ত্র ও সেন্সর খুব সহজেই রাফাল যুক্ত করা যায়। সেই শর্ত মেনে ফ্রান্সের দাসোঁ এভিয়েশন একটি ভারত নির্দিষ্ট ইন্টারফেস কন্ট্রোল ডকুমেন্ট বা আইসিডি তৈরির কথা ভাবছে বলে দাবি করা হচ্ছে রিপোর্টে।
‘আইসিডি না দিলে চুক্তি নয়’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় পক্ষের অবস্থান এখন যথেষ্ট স্পষ্ট। ১১৪টি রাফালর আলোচনায় আইসিডি পাওয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে উঠেছে। এমনকি ‘আইসিডি না দিলে চুক্তি নয়’ ধরনের কড়া অবস্থানও নিয়েছে দিল্লি বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে আইসিডি মানে রাফালের গোপন সোর্স কোড হাতে পাওয়া নয়। সোর্স কোড মূল যুদ্ধ ব্যবস্থার সফটওয়্যার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত এবং সেটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভারত আপাতত সেই পুরো কোড চাইছে না। বরং যুদ্ধবিমানের সঙ্গে বাইরের অস্ত্র, সেন্সর ও অন্যান্য ব্যবস্থা কী ভাবে যোগাযোগ করবে, সেই প্রযুক্তিগত কাঠামোর বিস্তারিত তথ্যই চাইছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই আইসিডি?
সহজ ভাষায় বললে, রাফালর সঙ্গে নতুন কোনও ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্র বা অস্ত্র জুড়তে হলে এতদিন মূল নির্মাতা সংস্থার সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিটি নতুন অস্ত্রকে বিমানের সঙ্গে মানানসই করতে আলাদা ভাবে পরীক্ষা, সফটওয়্যার পরিবর্তন এবং নির্মাতা সংস্থার সহায়তা লাগতে পারে।
কিন্তু ভারত যদি আইসিডির প্রয়োজনীয় তথ্য পায়, তাহলে দেশীয় সংস্থাগুলি নিজেদের অস্ত্র রাফালের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীনতা পাবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে অস্ত্রের পর অস্ত্র বদলাতে বা নতুন ব্যবস্থা যোগ করতে বার বার বিদেশি সংস্থার উপর নির্ভর করতে হবে না।
রাফাল হবে ‘ভারতীয়’
{{/usCountry}}কিন্তু ভারত যদি আইসিডির প্রয়োজনীয় তথ্য পায়, তাহলে দেশীয় সংস্থাগুলি নিজেদের অস্ত্র রাফালের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীনতা পাবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে অস্ত্রের পর অস্ত্র বদলাতে বা নতুন ব্যবস্থা যোগ করতে বার বার বিদেশি সংস্থার উপর নির্ভর করতে হবে না।
রাফাল হবে ‘ভারতীয়’
{{/usCountry}}দাসোঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট সুরক্ষিত ইন্টারফেস তৈরি করা হতে পারে। এর ফলে বিমানের মূল যুদ্ধ ব্যবস্থা আগের মতোই সুরক্ষিত থাকবে, কিন্তু নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতীয় অস্ত্র সেখানে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
এর সম্ভাব্য ফল বেশ বড়। দেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার বা অন্য কোনও সেন্সর ভবিষ্যতে রাফালে যুক্ত করার সময় ভারতের হাতে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি অস্ত্রের জন্য আলাদা করে দাসোঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে।
অ্যাস্ট্রা, রুদ্রামের পর আরও বড় পদক্ষেপ
ভারতীয় অস্ত্রকে রাফালের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ অবশ্য নতুন নয়। অ্যাস্ট্রা মার্ক ১, অ্যাস্ট্রা মার্ক ২ এবং রুদ্রাম ১ ক্ষেপণাস্ত্রকে রাফালে ব্যবহারের উপযোগী করার কাজ ইতিমধ্যেই দাসোঁর সঙ্গে হয়েছে। নতুন আইসিডি ব্যবস্থা সফল হলে ভবিষ্যতে আরও দেশীয় অস্ত্র যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সুখোইয়ের অভিজ্ঞতা এবার রাফালে
ভারতের কাছে এমন ব্যবস্থা একেবারে অচেনা নয়। সুখোই ৩০ এমকেআই প্রকল্পে ভারতীয় অস্ত্র সংযুক্তির ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্বাধীনতা পাওয়া গিয়েছিল। তবে নতুন রাফাল চুক্তিতে আইসিডি ব্যবস্থার গভীরতা আরও বেশি হতে পারে বলে দাবি করা হচ্ছে। এর ফলে দেশের সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলি আগামী দিনে নিজেদের অস্ত্র রাফাল প্ল্যাটফর্মে পরীক্ষার সুযোগ পাবে।
শুধু যুদ্ধবিমান কেনা নয়, প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণও
ভারতের কাছে এই চুক্তির গুরুত্ব তাই শুধু ১১৪টি যুদ্ধবিমান হাতে পাওয়া নয়। আসল লক্ষ্য ভবিষ্যতের রাফালেকে এমন একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা, যার উপর ভারত নিজস্ব প্রযুক্তি ও অস্ত্র ক্রমাগত যোগ করতে পারবে।
প্রস্তাবিত রাফাল চুক্তিতে ভারতে উৎপাদন, স্থানীয়করণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের পাশাপাশি আইসিডি নিয়ে আলোচনা সেই বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ। সব মিলিয়ে, আইসিডি নিয়ে ভারতের এই অবস্থান প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার দিকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। চুক্তি চূড়ান্ত হলে রাফালে শুধু ফ্রান্সের তৈরি যুদ্ধবিমান থাকবে না, ধীরে ধীরে ভারতীয় অস্ত্র ও প্রযুক্তির সঙ্গেও তার গভীর সংযোগ তৈরি হতে পারে। আর সেটাই আগামী দিনে রাফালে চুক্তির অন্যতম বড় কৌশলগত লাভ হয়ে উঠতে পারে।