পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা আপাতত কিছুটা কমলেও ভারতের অর্থনীতির সামনে ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি কাটেনি। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, রুপির বিনিময় হারের অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের ওঠানামা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে সম্ভাব্য বিঘ্ন- এই চারটি বিষয়কে আগামী দিনের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরেছে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। মঙ্গলবার প্রকাশিত অর্ধবার্ষিক আর্থিক স্থিতিশীলতা রিপোর্ট বা Financial Stability Report (FSR)-এ একদিকে যেমন ভারতের আর্থিক ব্যবস্থার শক্ত ভিতের কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বদলালে তার প্রভাব ভারতের ওপর কীভাবে পড়তে পারে, সে বিষয়েও স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
ভারতের অর্থনীতির শক্তির জায়গা কোথায়?

আরবিআইয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হল তার সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি। দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি সুস্থ। ব্যাংকগুলির মূলধন পর্যাপ্ত, তারল্যের কোনও ঘাটতি নেই এবং অনুৎপাদক সম্পদের (এনপিএ) হার বহু দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলেও ভারতীয় আর্থিক ব্যবস্থা তা সামাল দেওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে।
একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও এখনও বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলির মধ্যে অন্যতম দ্রুত। অভ্যন্তরীণ চাহিদা অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতিও এখনও আরবিআইয়ের নির্ধারিত সীমার মধ্যেই রয়েছে। এই কারণেই ভারতের অর্থনীতি অন্যান্য অনেক উদীয়মান অর্থনীতির তুলনায় বেশি স্থিতিস্থাপক বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবু কেন উদ্বেগ?
আরবিআইয়ের মতে, ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। দেশের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের সিংহভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে যদি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়, তাহলে তার প্রভাব সরাসরি ভারতের আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচের ওপর পড়বে। শুধু তেল নয়, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও পণ্যের সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটতে পারে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং শিল্পক্ষেত্রেও চাপ তৈরি হতে পারে।
ভারতীয় মুদ্রার ওপর কেন চাপ তৈরি হয়েছিল?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের সময় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমানোর কৌশল নেন। ফলে বিদেশি মূলধনের প্রবাহ কমে যায়। একই সঙ্গে আমদানিকারক এবং বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে বেশি পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে শুরু করেন। এর ফলেই ভারতীয় রুপির ওপর অবমূল্যায়নের চাপ তৈরি হয়। ভারতীয় মুদ্রা দুর্বল হলে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির খরচ বেড়ে যায়। বিশেষ করে তেল আমদানির বিল বাড়ে, যার প্রভাব পরোক্ষভাবে পেট্রোল-ডিজেল, পরিবহণ, খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামের ওপর পড়তে পারে।
সরকারি বন্ড বাজারেও কেন চাপ?
{{/usCountry}}প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের সময় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমানোর কৌশল নেন। ফলে বিদেশি মূলধনের প্রবাহ কমে যায়। একই সঙ্গে আমদানিকারক এবং বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ক্ষতি এড়াতে বেশি পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা কিনতে শুরু করেন। এর ফলেই ভারতীয় রুপির ওপর অবমূল্যায়নের চাপ তৈরি হয়। ভারতীয় মুদ্রা দুর্বল হলে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির খরচ বেড়ে যায়। বিশেষ করে তেল আমদানির বিল বাড়ে, যার প্রভাব পরোক্ষভাবে পেট্রোল-ডিজেল, পরিবহণ, খাদ্যপণ্য এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামের ওপর পড়তে পারে।
সরকারি বন্ড বাজারেও কেন চাপ?
{{/usCountry}}আরবিআই জানিয়েছে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের ফলনও বেড়ে গিয়েছিল। সাধারণভাবে বন্ডের ফলন বাড়ার অর্থ সরকার এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলির ঋণ গ্রহণের খরচও বেড়ে যাওয়া। যদিও সরকার আর্থিক ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, তবুও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এই বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে।
শেয়ারবাজার নিয়ে আরবিআইয়ের বিশেষ সতর্কবার্তা
প্রতিবেদনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বৈশ্বিক শেয়ারবাজার, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির শেয়ারের মূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগ। আরবিআই বলেছে, যদি আন্তর্জাতিক বাজারে এই খাতের শেয়ারগুলির মূল্যায়নে বড় ধরনের সংশোধন হয় বা কর্পোরেট মুনাফার প্রত্যাশা কমে যায়, তাহলে তার প্রভাব ভারতীয় শেয়ারবাজারেও পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের বিক্রি এবং বাজারের সংশোধনের পর অবশ্য ভারতীয় বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ভারতের সংযোগ যত বাড়ছে, ততই বাইরের ধাক্কার প্রভাবও দ্রুত অনুভূত হবে।
পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি এলেও ঝুঁকি শেষ নয়
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অন্তর্বর্তী শান্তি সমঝোতার ফলে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। রুপির ওপর চাপ কমেছে এবং বন্ডের ফলনও কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। কিন্তু আরবিআই মনে করিয়ে দিয়েছে, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল। নতুন করে সংঘাত শুরু হলে বা তেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।
মোটের ওপর কী বার্তা দিল আরবিআই?
এই প্রতিবেদনের মূল বার্তা হল—ভারতের অর্থনীতির ভিত বর্তমানে যথেষ্ট শক্তিশালী। ব্যাংকিং ব্যবস্থা সুস্থ, প্রবৃদ্ধি সন্তোষজনক এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর ভারতের নির্ভরতা এখনও উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে জ্বালানি ও বৈদেশিক মূলধনের ক্ষেত্রে। তাই বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বাড়লে তার প্রভাব থেকে ভারত পুরোপুরি মুক্ত নয়।
অর্থাৎ, ভারতের অর্থনীতি এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত হলেও আত্মতুষ্টির কোনও সুযোগ নেই। জ্বালানির দাম, বৈশ্বিক আর্থিক বাজার, বিদেশি বিনিয়োগের প্রবণতা এবং পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আগামী কয়েক মাসে ভারতের অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। আরবিআইয়ের এই প্রতিবেদন মূলত সেই সতর্কবার্তাই নতুন করে সামনে এনে দিল।