সমাজ ও পরিবারের চিরাচরিত প্রথা ভেঙে এক অনন্য নজির গড়লেন উত্তরপ্রদেশের মিরাটের এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারক। সাধারণত ভারতীয় সমাজে বিবাহবিচ্ছেদকে একটি সামাজিক কলঙ্ক বা দুঃখের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ডক্টর জ্ঞানেন্দ্র শর্মা তাঁর একমাত্র মেয়ে প্রণিতার বিবাহবিচ্ছেদকে উদযাপন করলেন ঢাক-ঢোল বাজিয়ে, ফুলের মালা পরিয়ে এবং মিষ্টি মুখ করিয়ে। মেয়ের কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে এই বাবা প্রমাণ করে দিলেন যে, মেয়ের সম্মান ও খুশি যে কোনও সামাজিক জড়তার চেয়ে অনেক বেশি দামী।

জানা গেছে, ২০১৮ সালে মিরাটের শাস্ত্রী নগরের এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের কন্যা প্রণিতার সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর গৌরব অগ্নিহোত্রীর বিয়ে হয়। গৌরব অগ্নিহোত্রী বর্তমানে পাঞ্জাবের জলন্ধরে কর্মরত। দম্পতির একটি পুত্রসন্তানও রয়েছে। বিয়ের প্রথম প্রথম স্বাভাবিক থাকলেও, ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে টানাপোড়েন বাড়তে শুরু করেন। শ্বশুরবাড়িতে হয়রানির শিকার হন প্রণিতা। বিয়ের কিছু সময় পর থেকেই শ্বশুরবাড়িতে তাঁর ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু হয় বলে অভিযোগ। নিজের সংসার বাঁচাতে প্রণিতা দীর্ঘ লড়াই চালিয়েছিলেন, এমনকী ২০২১ সালেও একবার বিচ্ছেদের উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় অবশেষে তিনি আইনি পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে প্রণিতার বাবা সবসময় তাঁর ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।
বিশেষ করে ২০২২ সালে এক পথ দুর্ঘটনায় নিজের ছেলেকে হারানোর পর, মেয়ের সুরক্ষা ডক্টর শর্মার কাছে প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। গত রবিবার মিরাট ফ্যামিলি কোর্ট থেকে বিবাহবিচ্ছেদের রায় আসার পরপরই আদালত চত্বরে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। পরিবারের সদস্যরা কালো রঙের টি-শার্ট পরে এসেছিলেন, যেখানে প্রণিতার ছবির সঙ্গে লেখা ছিল- 'আই লাভ মাই ডটার।' ঢাকের আওয়াজে মেতে ওঠেন আত্মীয়স্বজনরা, বিতরণ করা হয় লাড্ডু। প্রণিতাও একটি কালো রঙের টি-শার্ট পরেছিলেন, তাতে লেখা ছিল-'আমার পরিবার, আমার জীবন।' মেয়ের জন্মের সময় যেভাবে আনন্দ করেছিলেন, বিচ্ছেদের দিনেও ঠিক একইভাবে আনন্দ করে ডক্টর শর্মা বার্তা দিলেন যে, জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই মেয়ের গুরুত্ব সমান। তিনি বলেন, 'আমরা সমাজকে এই বার্তা দিতে চাই যে, সব মেয়ে ছেলেদের সমান। কোনও নারী যদি তার বিবাহিত জীবনে অসুখী হন, তবে তাকে জোর করে বিয়েতে বাধ্য করা উচিত নয়। ছয় বছর ধরে আমার মেয়ে অনেক কষ্ট সহ্য করেছে, কিন্তু এখন সে মুক্ত, এবং আমরা তার এই নতুন জীবনের সূচনাকে স্বাগত জানাই।' এই পুরো আয়োজনের পেছনে একটাই ভাবনা ছিল, যাতে মেয়েটি বিয়ে ভাঙার পর দুঃখে নয়, মর্যাদার সঙ্গে বাঁচে। আর এই ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতেই দেশজুড়ে প্রশংসার জোয়ার বয়ে যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন, প্রতিটি মেয়ের যদি এমন সহায়ক পরিবার থাকত, তবে কোনো লড়াই-ই কঠিন মনে হতো না।