ইউরোপের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান প্রকল্প ‘ফিউচার কমব্যাট এয়ার সিস্টেম’ বা এফসিএএস নিয়ে ফ্রান্সের দাসোঁ এভিয়েশন এবং ইউরোপীয় সংস্থা এয়ারবাসের মধ্যে মতবিরোধ বাড়ছে। আর সেই টানাপড়েনই ভারতের সামনে খুলে দিতে পারে নতুন সম্ভাবনা। প্রতিরক্ষা মহলে আলোচনা, এফসিএএস প্রকল্পের বাইরে গিয়ে ভারতকে একটি আলাদা ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিতে পারে এয়ারবাস। যদিও এই নিয়ে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব সামনে আসেনি। কথাবার্তা রয়েছে প্রাথমিক পর্যায়ে। তবু দিল্লির জন্য বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ ভারত নিজস্ব ‘অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট’ বা এএমসিএ তৈরি করছে। কিন্তু একই সঙ্গে নয়াদিল্লি একটি আন্তর্জাতিক ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্পে অংশ নেওয়ার পথও খুঁজছে। লক্ষ্য একটাই। ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে দ্রুত প্রবেশ।
ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান শুধু আকাশে লড়াই করবে না। এগুলি হবে উড়ন্ত কমান্ড সেন্টারের মতো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। একসঙ্গে একাধিক চালকহীন ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। উপগ্রহ, আগাম সতর্কীকরণ বিমান এবং অন্যান্য যুদ্ধ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
এই ধরনের যুদ্ধবিমানে নতুন প্রজন্মের সেন্সর, উন্নত স্টেলথ প্রযুক্তি, তথ্য আদানপ্রদানের ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক ইঞ্জিন প্রযুক্তি থাকার কথা। ফলে যে দেশ এই প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাবে, ভবিষ্যতের আকাশযুদ্ধে তার বড় সুবিধা থাকবে। এফসিএএস প্রকল্পটি ফ্রান্স, জার্মানি এবং স্পেনের যৌথ উদ্যোগ। কিন্তু শুরু থেকেই কাজের ভাগ, নেতৃত্ব এবং বৌদ্ধিক সম্পত্তির (ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি) অধিকার নিয়ে সমস্যা রয়েছে। দাসোঁ চাইছে যুদ্ধবিমানের মূল উন্নয়নকাজে তাদের নিয়ন্ত্রণ বেশি থাকুক। অন্য দিকে এয়ারবাস চাইছে ফ্রান্স, জার্মানি এবং স্পেনের মধ্যে আরও ভারসাম্যপূর্ণ কাজের ভাগ।
এই মতবিরোধ মেটাতে তিন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব একাধিক বার হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু শিল্পক্ষেত্রের সমস্যাগুলি পুরোপুরি কাটেনি। ফলে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এয়ারবাস বিকল্প পথ খুঁজছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এমনকি সুইডেনের প্রতিরক্ষা সংস্থা সাব-এর সঙ্গেও সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে প্রতিরক্ষা মহলে জল্পনা রয়েছে। যদিও এই ধরনের কোনও স্বাধীন প্রকল্প এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা হয়নি।
{{/usCountry}}এই মতবিরোধ মেটাতে তিন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব একাধিক বার হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু শিল্পক্ষেত্রের সমস্যাগুলি পুরোপুরি কাটেনি। ফলে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এয়ারবাস বিকল্প পথ খুঁজছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এমনকি সুইডেনের প্রতিরক্ষা সংস্থা সাব-এর সঙ্গেও সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে প্রতিরক্ষা মহলে জল্পনা রয়েছে। যদিও এই ধরনের কোনও স্বাধীন প্রকল্প এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা হয়নি।
{{/usCountry}}এখানেই ভারতের গুরুত্ব। একটি নতুন আন্তর্জাতিক প্রকল্প গড়ে উঠলে এয়ারবাস ভারতের ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা, উৎপাদন ক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের বড় বিমানচাহিদাকে কাজে লাগাতে চাইতে পারে। ভারতও পেতে পারে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে কাজ করার সুযোগ। তবে ভারতের সামনে আর একটি বড় বিকল্প রয়েছে। তা হল ‘গ্লোবাল কমব্যাট এয়ার প্রোগ্রাম’ বা জিসিএপি। এই প্রকল্পে ব্রিটেন, জাপান এবং ইতালি একসঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু এই তিন দেশের মধ্যে ইতিমধ্যেই কাজের ভাগ এবং প্রকল্পের কাঠামো অনেকটাই স্থির। ফলে ভারত সেখানে বড় ধরনের উন্নয়ন ভূমিকা পাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এই কারণেই এয়ারবাসের সম্ভাব্য প্রস্তাব ভারতের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। দিল্লি শুধু যুদ্ধবিমান কিনতে চাইছে না। প্রযুক্তি এবং শিল্পে অংশীদার হতে চাইছে। সে ক্ষেত্রে প্রকল্পের শুরু থেকেই জায়গা পাওয়া বড় সুবিধা। তবে ভারতের সিদ্ধান্তে নৌবাহিনীর প্রয়োজনও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ভবিষ্যতে ভারতীয় বিমানবাহী রণতরীতে উন্নত যুদ্ধবিমান মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। টুইন ইঞ্জিন ডেক-বেসড ফাইটার বা টিইডিবিএফ এখন নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। কিন্তু ২০৪০-এর পরের সময়ের জন্য ষষ্ঠ প্রজন্মের নৌ-যুদ্ধবিমান নিয়েও ভাবতে হবে।
এই জায়গায় দাসোঁর সম্ভাব্য প্রস্তাব বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। কারণ দাসো তাদের ভবিষ্যৎ ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের নৌ-সংস্করণ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে বলে জানা যাচ্ছে। অন্য দিকে এয়ারবাসের স্বাধীন পরিকল্পনায় এখনও এমন ক্যারিয়ার-ভিত্তিক সংস্করণের বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
অর্থাৎ স্থলভিত্তিক বিমান নয়, বিমানবাহী রণতরীর জন্য যুদ্ধবিমানও চাইলে ভারতের কাছে দাসোঁর প্রস্তাব বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।
তবে এএমসিএ-র কথা ভুললে চলবে না। এটিই ভারতের নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্প। আন্তর্জাতিক প্রকল্পে যোগ দিলেও এএমসিএ-র কাজ থামবে না। বরং বিদেশি প্রকল্প থেকে পাওয়া প্রযুক্তি এবং অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে ভারতীয় যুদ্ধবিমান তৈরির ক্ষমতা আরও বাড়াতে পারে।
তাই এয়ারবাস শেষ পর্যন্ত সত্যিই ভারতকে কোনও প্রস্তাব দেয় কি না, সেটাই এখন দেখার। একই সঙ্গে এফসিএএস প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও নজর থাকবে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার। ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্পে তৈরি হওয়া বিভাজন ভারতের জন্য নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। বিশ্বজুড়ে ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির দৌড় শুরু হয়ে গিয়েছে। সেই দৌড়ে ভারত শুধু ক্রেতা হতে চায় না। প্রযুক্তি, উৎপাদন এবং নকশার অংশীদার হতে চায়। এয়ারবাসের সম্ভাব্য উদ্যোগ সেই লক্ষ্য পূরণের নতুন সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।