মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ নিয়ে যখন রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে, তখন মামলাটি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিল সুপ্রিম কোর্ট। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে সরাসরি কোনও নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানাল শীর্ষ আদালত। আগে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানা প্রয়োজন। অর্থাৎ অভিযোগ উঠলেই তার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নয়, আদালত চাইছে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যও নথিভুক্ত হোক।
জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ?

জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলিতে মূল অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের একাধিক সিদ্ধান্ত তাঁর দুই সহকর্মী নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সন্ধু এবং বিবেক যোশীর সম্মতি ছাড়াই নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর, ভোটার যুক্ত করার নিয়ম, ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সফটওয়্যার বদল এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
দুই নির্বাচন কমিশনার গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল। সেই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসার পরই নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হয়। বিরোধীদের অভিযোগ, তিন সদস্যের কমিশনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার্যত এক ব্যক্তির হাতে চলে গিয়েছিল।
আদালতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন
এই অভিযোগের ভিত্তিতেই সুপ্রিম কোর্টে একাধিক আবেদন জমা পড়ে। পাটনার বাসিন্দা রাকেশ কুমার সিংহের আবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা কি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার একা প্রয়োগ করতে পারেন?
আবেদনকারীর বক্তব্য, জ্ঞানেশ কুমার কমিশনের চেয়ারম্যান। কিন্তু চেয়ারম্যান হওয়া আর পুরো কমিশন হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা কমিশন নামের বহুসদস্যের প্রতিষ্ঠানটির। তাই একক ভাবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়ে থাকলে তা আইনসঙ্গত কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
{{/usCountry}}আবেদনকারীর বক্তব্য, জ্ঞানেশ কুমার কমিশনের চেয়ারম্যান। কিন্তু চেয়ারম্যান হওয়া আর পুরো কমিশন হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা কমিশন নামের বহুসদস্যের প্রতিষ্ঠানটির। তাই একক ভাবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়ে থাকলে তা আইনসঙ্গত কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
{{/usCountry}}অন্য একটি আবেদনে দিল্লির আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন অথবা বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের আবেদন করা হয়েছে। জ্ঞানেশ কুমার এবং কয়েক জন শীর্ষ আধিকারিকের বিরুদ্ধে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে আইনগত পদক্ষেপের দাবিও রয়েছে।
এসআইআর নিয়েই সবচেয়ে বড় বিতর্ক
পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এসআইআর। নির্বাচন কমিশন অবশ্য ধারাবাহিক ভাবে অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, গত এক বছরে কমিশনের সব সিদ্ধান্তই সর্বসম্মত ভাবে নেওয়া হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলাকালীন মতামত বা প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে কমিশনের অবস্থান এক ছিল।
কমিশন আরও জানিয়েছে, এসআইআর সংক্রান্ত মূল সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ভাবেই নেওয়া হয়েছিল এবং সেই প্রক্রিয়াকে সুপ্রিম কোর্টও ইতিমধ্যে আইনি বলে মেনে নিয়েছে। ফলে বিরোধীদের অভিযোগ এবং কমিশনের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট ফারাক রয়েছে।
ভোটাধিকার নিয়েও আদালতের সতর্কতা
এর মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়ার একটি মন্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেছেন, এমন কোনও প্রক্রিয়া যাতে কোটি কোটি ভারতীয় ভোটাধিকার হারান, তা সংবিধানের চোখে স্বাভাবিক হতে পারে না। কোনও নাগরিককে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলে তা গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোর উপর আঘাত করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে এই মন্তব্য জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে চলা মামলার চূড়ান্ত রায় নয়। মামলায় থাকা অভিযোগ এবং এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পর্কে আদালতের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আলাদা বিষয়।
এখন কমিশনের জবাব গুরুত্বপূর্ণ
সুপ্রিম কোর্টের আজকের অবস্থান থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। শুধুমাত্র সংবাদপত্রে প্রকাশিত অভিযোগের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত নির্দেশ দিতে চাইছে না আদালত। কমিশনের জবাব, নথি এবং আইনি অবস্থান খতিয়ে দেখেই পরবর্তী পদক্ষেপ করতে চায় শীর্ষ আদালত।
এই মামলার গুরুত্ব তাই শুধু জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে নয়। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি এবং দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার উপর সাধারণ মানুষের আস্থা কতটা অটুট রয়েছে, সেই বড় প্রশ্নও সামনে এসেছে। এখন নজর, কমিশন আদালতে কী ব্যাখ্যা দেয় এবং সেই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট পরবর্তী শুনানিতে কতটা কঠোর অবস্থান নেয়।