‘বন্দে মাতরম’ গাইছেন না কেউ। তাতে কি তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতে পারে? এই প্রশ্নেই এ বার গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল সুপ্রিম কোর্ট। ধর্মীয় বিশ্বাস বা বিবেকের কারণে কোনও ব্যক্তি জাতীয় সঙ্গীত বা জাতীয় গান গাইতে আপত্তি করলে তাঁকে শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়া যাবে না—১৯৮৬ সালের একটি পুরনো রায়ের কথা মনে করিয়ে মঙ্গলবার কেন্দ্রকে কার্যত সেই বার্তাই দিল শীর্ষ আদালত। বিষয়টি এখন বিচারাধীন, তবে আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ঘিরে জাতীয় গান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

মামলাটি দায়ের করেছেন কর্ণাটিক সঙ্গীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণ। ২০২৬ সালে সংশোধিত ‘Prevention of Insults to National Honour Act, 1971’-এর একটি ধারা এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ২৮ জানুয়ারি ও ৯ জুলাইয়ের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেছেন তিনি। ওই নির্দেশে সরকারি, আনুষ্ঠানিক এবং নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’-এর ছয়টি স্তবক গাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কৃষ্ণের বক্তব্য, গানের শেষ চারটি স্তবকে দেবদেবীর উল্লেখ রয়েছে। তাই সব নাগরিকের উপর সম্পূর্ণ গান গাওয়ার বাধ্যবাধকতা ধর্মীয় স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা এবং সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনা। বিচারপতি বাগচী স্পষ্ট করে দেন, ‘জাতীয় গান’ হিসেবে কোন গান বা কতগুলি স্তবক থাকবে, সেটি আদালত ঠিক করতে যাচ্ছে না। গণতান্ত্রিক সরকারেরই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। আদালতের প্রশ্ন অন্য জায়গায়—কেউ যদি ধর্মীয় বিশ্বাস বা নিজের বিবেকের কারণে গানটি গাইতে না চান, তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি শাস্তির ব্যবস্থা করা যাবে কি না।
এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে ১৯৮৬ সালের ‘Bijoe Emmanuel vs State of Kerala’ মামলা। সেই মামলায় কয়েক জন স্কুলপড়ুয়া ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে অস্বীকার করলেও তাঁরা যথাযথ সম্মান দেখিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট তখন তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সমর্থন করেনি। মঙ্গলবার বিচারপতি বাগচী জানান, সেই রায়ে যে আইনি নীতি নির্ধারিত হয়েছিল, তা এখনও প্রশ্নের মুখে পড়েনি। তাই নতুন আইনের ক্ষেত্রেও সেই নীতিই কার্যকর থাকবে বলে আদালত আশা করছে।
{{/usCountry}}এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে ১৯৮৬ সালের ‘Bijoe Emmanuel vs State of Kerala’ মামলা। সেই মামলায় কয়েক জন স্কুলপড়ুয়া ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে অস্বীকার করলেও তাঁরা যথাযথ সম্মান দেখিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট তখন তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সমর্থন করেনি। মঙ্গলবার বিচারপতি বাগচী জানান, সেই রায়ে যে আইনি নীতি নির্ধারিত হয়েছিল, তা এখনও প্রশ্নের মুখে পড়েনি। তাই নতুন আইনের ক্ষেত্রেও সেই নীতিই কার্যকর থাকবে বলে আদালত আশা করছে।
{{/usCountry}}কৃষ্ণের আইনজীবী প্রবীণ আইনজীবী এস মুরলীধর আরও একটি প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর দাবি, সংশোধিত আইনে ‘জাতীয় গান’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, তা স্পষ্ট ভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। পাশাপাশি ছয়টি স্তবককে বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ একটি অফিস মেমোর মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে, যা গেজেটভুক্ত নয় বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, এই অস্পষ্টতা ভবিষ্যতে আইনের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
শুনানির সময় অবশ্য আইনজীবীদের মধ্যে তর্কও বাধে। কেন্দ্রের সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা ‘সেক্যুলারিজম এত সরু হতে পারে না’ বলে মন্তব্য করেন। পরে আইন তৈরির প্রসঙ্গে তিনি ‘নকশাল’ শব্দ ব্যবহার করলে মুরলীধর তীব্র আপত্তি জানান এবং মন্তব্য প্রত্যাহারের দাবি করেন। মেহতা অবশ্য মন্তব্য প্রত্যাহার করেননি। আদালত ওই বাক্বিতণ্ডাকে নিজেদের নথিভুক্ত পর্যবেক্ষণের অংশ করেনি।
এখন কেন্দ্রকে জবাব দিতে হবে। তার পরেই মামলাটি নিয়ে পরবর্তী শুনানি হবে। অর্থাৎ, ‘বন্দে মাতরম’-এর কোন অংশ গাওয়া হবে, তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই শুনানিতে হয়নি। কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাস বা বিবেকের কারণে কেউ গানটি না গাইলে তাঁকে ফৌজদারি শাস্তির মুখে পড়তে হবে কি না—এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখন সুপ্রিম কোর্টের সামনে।