Supreme Court: ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলা খারিজ করে দিল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। তবে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে যন্ত্রণাদায়ক ও কষ্ট কমিয়ে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মর্যাদা বজায় রাখতে আরও উপযুক্ত কোনও বিকল্প পদ্ধতি রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় সরকার স্বাধীন।

'লাইভ ল'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করে। মামলাটি ছিল ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ৩৫৪(৫) ধারার সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে। ওই ধারায় বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে 'মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত গলায় ফাঁস দিয়ে ঝোলাতে হবে।' সিনিয়র আইনজীবী ঋষি মালহোত্র এই জনস্বার্থ মামলাটি দায়ের করেছিলেন। তাঁর আবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে যন্ত্রণা ও কষ্ট হতে পারে। তিনি ফাঁসির পরিবর্তে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন, গুলি করে মৃত্যু, বৈদ্যুতিক চেয়ারে মৃত্যুদণ্ড কিংবা গ্যাস চেম্বারের মতো বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহারের আবেদন করেছিলেন।
ভবিষ্যতে সাংবিধানিক পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে
জনস্বার্থ মামলাটি খারিজ করলেও সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, ভবিষ্যতে যদি চিকিৎসাবিজ্ঞান বা বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে এমন কোনও জোরালো প্রমাণ সামনে আসে, যার ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হয়, তাহলে বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে ফের খতিয়ে দেখা যেতে পারে। শীর্ষ আদালত আরও জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় সরকার চাইলে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করতে পারে। সেই পর্যালোচনায় এমন কোনও পদ্ধতি বেশি উপযুক্ত কিনা, যা যন্ত্রণা ও কষ্ট কমানোর পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির মর্যাদা রক্ষা করতে পারে, তা বিবেচনা করা যেতে পারে।
কী নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল জনস্বার্থ মামলা?
এই জনস্বার্থ মামলার আবেদনে ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ৩৫৪(৫) ধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়েছিল। মামলাকারীর অভিযোগ ছিল, এই বিধান বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে দেওয়া জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিগত মর্যাদার অধিকারের পরিপন্থী। একই সঙ্গে সংবিধান বেঞ্চের ‘গিয়ান কৌর’ মামলার রায়ের সঙ্গেও এই বিধানের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। মামলাকারী দাবি করেছিলেন, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রেও মর্যাদাপূর্ণ পদ্ধতির অধিকার স্বীকৃত হওয়া উচিত।
{{/usCountry}}এই জনস্বার্থ মামলার আবেদনে ফৌজদারি কার্যবিধির (CrPC) ৩৫৪(৫) ধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়েছিল। মামলাকারীর অভিযোগ ছিল, এই বিধান বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে দেওয়া জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিগত মর্যাদার অধিকারের পরিপন্থী। একই সঙ্গে সংবিধান বেঞ্চের ‘গিয়ান কৌর’ মামলার রায়ের সঙ্গেও এই বিধানের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। মামলাকারী দাবি করেছিলেন, সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রেও মর্যাদাপূর্ণ পদ্ধতির অধিকার স্বীকৃত হওয়া উচিত।
{{/usCountry}}আবেদনে দাবি করা হয়েছিল যে, ফাঁসির পর কোনও বন্দিকে মৃত ঘোষণা করতে ৪০ মিনিটেরও বেশি সময় লাগতে পারে। এর বিপরীতে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে কয়েক মিনিট এবং প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে প্রায় পাঁচ মিনিট সময় লাগতে পারে বলে দাবি করা হয়েছিল। মামলাকারীর যুক্তি দেন যে, ফাঁসি একটি 'বর্বর, অমানবিক ও নিষ্ঠুর' পদ্ধতি। তিনি রাষ্ট্রসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের বিভিন্ন প্রস্তাবের কথাও আবেদনে উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, সেখানে এমন পদ্ধতিই বেছে নেওয়া উচিত যাতে যতটা সম্ভব কম যন্ত্রণা হয়।
বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের সুপারিশ
এই প্রথমবার নয়। এর আগেও ফাঁসির বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আলোচনা হয়েছে। ২০২৩ সালের মে মাসে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল শীর্ষ আদালতকে জানিয়েছিলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আরও উন্নত কোনও পদ্ধতি রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ওই কমিটিতে কারা থাকবেন, তা নিয়েও সরকার চিন্তাভাবনা করছে। গত বছর পরবর্তী শুনানিতে মামলাকারীর পক্ষ থেকে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনকে বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়। যুক্তি দেওয়া হয়, ফাঁসির তুলনায় এটি দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে মানবিক পদ্ধতি। তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের ফাঁসি অথবা প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনের মধ্যে কোনও একটি পদ্ধতি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য আদালতকে আবেদন করেছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমন পদ্ধতির ব্যবহার রয়েছে বলেও আদালতের নজরে আনা হয়।
'প্রজেক্ট ৩৯এ' প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে শুনানির সময় প্রজেক্ট ৩৯এ (Project 39A)-ও আদালতে বক্তব্য রাখে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ বিভিন্ন দেশে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশনের ব্যবহার এবং তার অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। প্রজেক্ট ৩৯এ-র পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাস্তবে প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন সবসময় সফল বা সমস্যামুক্ত পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। সংগঠনটি পরামর্শ দেয়, বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে আরও প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করে যে ফাঁসির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মাত্রায় যন্ত্রণা ও কষ্টের সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ ফাঁসি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনও বন্দির মৃত্যু ঘটে না।
শুনানির সময় আদালত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবে কেন্দ্রের আপত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল। অন্যদিকে, বিচারপতি সন্দীপ মেহতা ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে জল্লাদের উপর সম্ভাব্য মানসিক প্রভাবের বিষয়টিও উল্লেখ করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরামানি আদালতকে জানিয়েছিলেন, বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকার 'সর্বোচ্চ পর্যায়ে' বিবেচনা করছে এবং ইতিমধ্যেই কয়েকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট এই জনস্বার্থ মামলায় চলতি বছরের জানুয়ারিতেই রায় সংরক্ষণ করেছিল। মামলাকারী তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে আইন কমিশন অফ ইন্ডিয়ার একটি রিপোর্টও তুলে ধরেছিলেন। ওই রিপোর্টে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিভিন্ন পদ্ধতির তুলনামূলক বিশ্লেষণ রয়েছে।