আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে ‘নন-সিটিজেন’ বা মার্কিন নাগরিক নন, এমন ভোটারদের চিহ্নিত করে তাঁদের ভোট বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু সেই উদ্যোগে বড় ধাক্কা খেলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় ২০ হাজার ভোটারের ভোট গণনা স্থগিত রাখার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন খারিজ করে দেয় আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ, প্রশাসনের তৈরি করা তালিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। ফলে নির্বাচনের আগে ভোটারদের একাংশের ভোটাধিকার খর্ব করার যে চেষ্টা হয়েছিল, তা আপাতত আটকে গেল।

ঘটনার সূত্রপাত মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটির (DHS) তৈরি একটি তালিকাকে ঘিরে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি ছিল, ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটার তালিকায় এমন বহু মানুষের নাম রয়েছে, যাঁরা আদতে মার্কিন নাগরিক নন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে প্রায় ২০ হাজার ভোটারের ব্যালট আলাদা করে রাখার আবেদন জানায় মার্কিন বিচার বিভাগ। নাগরিকত্ব যাচাই না হওয়া পর্যন্ত ওই ভোটগুলি গণনা না করার দাবি জানানো হয়। এমনকী, ওই ভোট গুনলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্প নিজেও সমাজমাধ্যমে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছিলেন, নিয়ম ভেঙে ভোট গণনা করলে সংশ্লিষ্টদের জেলে যেতে হতে পারে।
কিন্তু প্রশাসনের এই দাবির সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচনী আধিকারিকরা। লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির কর্তারা তালিকা থেকে বেছে নেওয়া ২০০টি নাম পরীক্ষা করেন। দেখা যায়, যেসব নথিতে জন্মস্থানের তথ্য পাওয়া গিয়েছে, তার মধ্যে ৩৮.৯ শতাংশ ব্যক্তির জন্ম আমেরিকাতেই। অর্থাৎ, তাঁদের মার্কিন নাগরিক হওয়ার জোরালো প্রমাণ রয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই ২০০ জনের মধ্যে ১১২ জনের ভোটার নিবন্ধন ইতিমধ্যেই বাতিল অথবা নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিল। ফলে তালিকাটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমনকী, ট্রাম্প প্রশাসনও স্বীকার করে যে তালিকায় এমন কিছু নাম থাকতে পারে, যাঁরা শেষ পর্যন্ত মার্কিন নাগরিক হিসেবেই প্রমাণিত হবেন।
এর আগেও একই ধরনের ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। নেভাডায় প্রথমে প্রায় ১৬ হাজার ভোটারের নাম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু হাতে-কলমে যাচাইয়ের পরে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৮৫-তে। আশ্চর্যের বিষয়, শেষ পর্যন্ত ওই ১৮৫ জনের প্রত্যেকেই মার্কিন নাগরিক বলে প্রমাণিত হন। ক্যালিফোর্নিয়ার ঘটনাতেও একইভাবে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
{{/usCountry}}এর আগেও একই ধরনের ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। নেভাডায় প্রথমে প্রায় ১৬ হাজার ভোটারের নাম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু হাতে-কলমে যাচাইয়ের পরে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৮৫-তে। আশ্চর্যের বিষয়, শেষ পর্যন্ত ওই ১৮৫ জনের প্রত্যেকেই মার্কিন নাগরিক বলে প্রমাণিত হন। ক্যালিফোর্নিয়ার ঘটনাতেও একইভাবে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
{{/usCountry}}মামলাটি প্রথমে জেলা আদালতে ওঠে। গত ২৮ অক্টোবর বিচারক ডেভিড কার্টার ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন খারিজ করে দেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল, প্রমাণ ছাড়া ভোট বাতিল বা গণনা আটকে দেওয়ার চেষ্টা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক। পরে আপিল আদালতও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। শেষ পর্যন্ত ২ নভেম্বর মার্কিন সুপ্রিম কোর্টও ট্রাম্প প্রশাসনের আবেদন খারিজ করে দেয়। যদিও সর্বোচ্চ আদালত নিজেদের সিদ্ধান্তের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি, এই রায়ে নির্বাচনের আগে বিতর্কিত ভোটগুলি আলাদা করে রাখার প্রশাসনিক উদ্যোগ আটকে যায়। তবে প্রকৃত প্রমাণ থাকলে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে পৃথকভাবে বেআইনি ভোটদানের মামলা করার রাস্তা খোলা রয়েছে।
এদিকে শুধু ভোটার তালিকা পরীক্ষা নয়, নাগরিকত্ব যাচাই করতে সাধারণ মানুষের বাড়িতে পৌঁছে যাচ্ছিলেন মার্কিন আধিকারিকরাও। 'আনলফুল ভোটার ইনিশিয়েটিভ' নামে একটি কর্মসূচির অধীনে নয়টি রাজ্যে তদন্ত শুরু করেছিল হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ। বিশেষ করে যাঁরা জন্মসূত্রে নয়, পরবর্তীকালে নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তাঁদের নিশানা করা হচ্ছিল। তাঁরা নাগরিকত্ব পাওয়ার আগে ভোট দিয়েছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ ছিল তদন্তকারীদের কাছে। কিন্তু প্রত্যেক ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য সর্বোচ্চ ১২ মিনিট সময় দেওয়ায় ভুলের আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। গত ২১ অক্টোবর এক জেলা বিচারক নির্বাচনের দিন পর্যন্ত এই তদন্ত স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। কারণ, আমেরিকায় বসবাসকারী প্রত্যেকের নাগরিকত্বের তথ্য রয়েছে, এমন কোনও কেন্দ্রীয় সরকারি ডেটাবেস নেই।
এই গোটা বিতর্কে ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-এর প্রসঙ্গও টেনে এনেছেন ট্রাম্প। ভারত এবং ব্রাজিলের ভোটার যাচাইয়ের পদ্ধতির প্রশংসা করে আমেরিকাতেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালুর পক্ষে সওয়াল করেছেন তিনি। ভারতের SIR-এ খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। তবে সেই তালিকায় মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিকবার নথিভুক্ত এবং অন্যান্য অসঙ্গতিপূর্ণ নামও ছিল। তবে ভারতের এসআইআরের আদলে মার্কিন ভোটে হস্তক্ষেপ করতে গিয়েও ব্যর্থ হন ডোনাল্ড ট্রাম্প।