মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বীরত্বগাথা আমাদের সবার জানা। কিন্তু যুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায়ে এমন কিছু রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটেছিল, যা মূল মহাকাব্যের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এমনই এক বিস্ময়কর চরিত্র হলেন অর্জুন ও মণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদার পুত্র বভ্রুবাহন। পুরাণ অনুসারে, তিনি ছিলেন এমন এক মহাবীর যিনি রণক্ষেত্রে স্বয়ং নিজের পিতা অর্জুনকে পরাজিত করে বধ করেছিলেন।

অর্জুন-পুত্র বভ্রুবাহনের সেই দুর্ধর্ষ কাহিনি এবং পিতা-পুত্রের যুদ্ধের নেপথ্য কারণ জেনে নিন।
মহাভারত ও অশ্বমেধ পর্বের কাহিনি অনুসারে, বভ্রুবাহন ছিলেন অর্জুনের তেজস্বী পুত্র। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা মণিপুর রাজ্যে। অর্জুন যখন বনবাসকালে মণিপুরে গিয়েছিলেন, তখন রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদার প্রেমে পড়েন। তাঁদের বিয়ের শর্ত ছিল যে, তাঁদের সন্তান মণিপুরের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবে এবং সে পাণ্ডবদের রাজ্যে যাবে না। এই কারণেই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে বভ্রুবাহনকে দেখা যায়নি।
যুদ্ধের সূত্রপাত: অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পর যুধিষ্ঠির যখন হস্তিনাপুরের রাজা হলেন, তখন তিনি অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেন। যজ্ঞের ঘোড়াটি বিশ্ববিজয়ে বের হয় এবং তার রক্ষক হিসেবে ছিলেন স্বয়ং অর্জুন। ঘুরতে ঘুরতে সেই ঘোড়া যখন মণিপুর রাজ্যে পৌঁছায়, তখন তরুণ রাজা বভ্রুবাহন শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে তাঁর পিতার ঘোড়াটি আটকে দেন। তিনি চেয়েছিলেন বীরের মতো যুদ্ধ করে পিতার আশীর্বাদ নিতে।
কিন্তু অর্জুন তাঁর পুত্রকে চিনতে পারেননি। তিনি বভ্রুবাহনকে একজন সাধারণ ঔদ্ধত্যপূর্ণ রাজা মনে করে তিরস্কার করেন এবং যুদ্ধে আহ্বান জানান। অন্যদিকে, অর্জুনের দ্বিতীয় স্ত্রী নাগকন্যা উলূপী (যিনি বভ্রুবাহনের বিমাতা) বভ্রুবাহনকে প্ররোচিত করেন অর্জুনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে।
পিতা-পুত্রের ভয়ঙ্কর যুদ্ধ ও অর্জুনের মৃত্যু
{{/usCountry}}কিন্তু অর্জুন তাঁর পুত্রকে চিনতে পারেননি। তিনি বভ্রুবাহনকে একজন সাধারণ ঔদ্ধত্যপূর্ণ রাজা মনে করে তিরস্কার করেন এবং যুদ্ধে আহ্বান জানান। অন্যদিকে, অর্জুনের দ্বিতীয় স্ত্রী নাগকন্যা উলূপী (যিনি বভ্রুবাহনের বিমাতা) বভ্রুবাহনকে প্ররোচিত করেন অর্জুনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে।
পিতা-পুত্রের ভয়ঙ্কর যুদ্ধ ও অর্জুনের মৃত্যু
{{/usCountry}}রণক্ষেত্রে পিতা অর্জুন ও পুত্র বভ্রুবাহনের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়। অর্জুন তাঁর দিব্যশক্তির দম্ভে ছিলেন মত্ত। কিন্তু বভ্রুবাহন ছিলেন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। যুদ্ধের এক পর্যায়ে বভ্রুবাহন এমন এক অব্যর্থ শর নিক্ষেপ করেন যা অর্জুনের বুক বিদ্ধ করে। মহাবীর অর্জুন, যিনি ভীষ্ম-দ্রোণ-কর্ণের মতো বীরদের জয় করেছিলেন, তিনি নিজ পুত্রের বাণে প্রাণ হারিয়ে রণক্ষেত্রে লুটিয়ে পড়েন।
অর্জুনের পুনর্জীবন ও অভিশাপের রহস্য
পিতার মৃতদেহ দেখে বভ্রুবাহন শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। তখন নাগকন্যা উলূপী সেখানে উপস্থিত হন এবং আসল রহস্য উন্মোচন করেন। আসলে এই ঘটনাটি ছিল একটি অলৌকিক প্রতিশোধ। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে শিখণ্ডীকে সামনে রেখে অর্জুন যেভাবে ভীষ্মদেবকে শরশয্যায় শায়িত করেছিলেন, সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে বসুগণ (ভীষ্মের ভাইরা) অর্জুনকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে তিনি নিজ পুত্রের হাতেই নিহত হবেন।
উলূপী তাঁর কাছে থাকা 'সঞ্জীবনী মণি' বভ্রুবাহনকে দেন। সেই মণির স্পর্শে অর্জুন পুনরায় প্রাণ ফিরে পান। অর্জুন তাঁর পুত্রের বীরত্ব দেখে মুগ্ধ হন এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। হস্তিনাপুরের অশ্বমেধ যজ্ঞে বভ্রুবাহন সসম্মানে আমন্ত্রিত হন।
কেন এই কাহিনি গুরুত্বপূর্ণ?
বভ্রুবাহনের কাহিনি আমাদের শেখায় যে— কর্মফল বা অভিশাপ থেকে দেবতারাও মুক্ত নন। অর্জুনের মতো মহাবীরকেও অহংকারের জন্য নিজ সন্তানের কাছে মাথা নত করতে হয়েছিল। এটি মহাভারতের অন্যতম একটি অধ্যায় যা বীরত্ব এবং ত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ।