চাইলে ১ মিনিটে শেষ করে দিতে পারতেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ! ভীমের নাতি বার্বরিককে কেন খাটু শ্যাম নামে ডাকা হয়

ভীমের নাতি এবং ঘটোৎকচের পুত্র বার্বরিক ছিলেন এমন এক যোদ্ধা, যিনি চাইলে মাত্র এক মিনিটে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ করে দিতে পারতেন। অথচ, ইতিহাসের এই মহাবীরকে কেন রণক্ষেত্রে নামতে দেওয়া হলো না? এর নেপথ্যে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর ও বিস্ময়কর কাহিনি।

Published on: Feb 17, 2026 11:54 AM IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বিশাল ক্যানভাসে যেমন অর্জুন, কর্ণ বা ভীষ্মের মতো বীরদের বীরত্বগাথা অমর হয়ে আছে, তেমনই কিছু চরিত্র লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়ে গেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো বার্বরিক। ভীমের নাতি এবং ঘটোৎকচের পুত্র বার্বরিক ছিলেন এমন এক যোদ্ধা, যিনি চাইলে মাত্র এক মিনিটে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ করে দিতে পারতেন। অথচ, ইতিহাসের এই মহাবীরকে কেন রণক্ষেত্রে নামতে দেওয়া হলো না? এর নেপথ্যে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর ও বিস্ময়কর কাহিনি।

চাইলে ১ মিনিটে শেষ করে দিতে পারতেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ! তিনি ভীমের নাতি বার্বরিক
চাইলে ১ মিনিটে শেষ করে দিতে পারতেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ! তিনি ভীমের নাতি বার্বরিক

নিচে বার্বরিকের সেই ত্যাগ ও বীরত্বের কাহিনি বলা হল।

কেন ভীমের নাতি বার্বরিককে যুদ্ধে লড়তে দেননি শ্রীকৃষ্ণ?

মহাভারত অনুযায়ী, বার্বরিক ছিলেন ভীমের নাতি, ঘটোৎকচ এবং নাগকন্যা অহিলাবতীর সন্তান। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অপরাজেয় এবং অসীম ক্ষমতার অধিকারী। শিবের উপাসনা করে তিনি লাভ করেছিলেন 'তিনটি অব্যর্থ বাণ' এবং এক বিশেষ ধনুক। এই তিন বাণ দিয়ে তিনি সমগ্র বিশ্বকে জয় করতে পারতেন।

বার্বরিকের তিন বাণের অলৌকিক শক্তি

বার্বরিকের প্রথম বাণটি শত্রু ও মিত্রদের চিহ্নিত করত। দ্বিতীয় বাণটি যাকে রক্ষা করার কথা তাকে চিহ্নিত করত এবং তৃতীয় বাণটি চিহ্নিত করা সমস্ত শত্রুকে নিমিষে বিনাশ করে পুনরায় বার্বরিকের তূণীরে ফিরে আসত। অর্থাৎ, এই অস্ত্র চালনা করলে লক্ষ লক্ষ সেনার ভিড়েও কোনো নিরপরাধ বা মিত্রপক্ষের কেউ আঘাত পেতেন না, কেবল শত্রুরাই ধ্বংস হতো।

‘হারতে থাকা পক্ষের জন্য লড়াই করব’

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ যখন আসন্ন, বার্বরিক তাঁর মা অহিলাবতীর কাছে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। মা তাঁকে এই শর্তে যেতে দিলেন যে, তিনি রণক্ষেত্রে কেবল সেই পক্ষকেই সমর্থন করবেন যারা তুলনামূলক দুর্বল এবং হারতে থাকবে। বার্বরিক কথা দিলেন, "হারতে থাকা পক্ষের পাশে আমি থাকব।"

শ্রীকৃষ্ণের কৌশল ও ছদ্মবেশ

বার্বরিক যখন কুরুক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, শ্রীকৃষ্ণ তাঁর প্রতিজ্ঞা সম্পর্কে অবগত হলেন। তিনি বুঝলেন, বার্বরিক যদি যুদ্ধে নামেন তবে এক বিপর্যয় ঘটবে। কারণ, বার্বরিক যখনই দুর্বল পক্ষের (প্রথমে পাণ্ডব) হয়ে লড়তে শুরু করবেন, তখন শক্তিশালী কৌরব সেনা ধ্বংস হতে থাকবে। আবার কৌরব পক্ষ যখন দুর্বল হয়ে পড়বে, তখন বার্বরিক তাঁর প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী কৌরবদের পক্ষে যোগ দেবেন। এইভাবে দু'পক্ষই বারবার ধ্বংস হতে হতে কেউ আর বেঁচে থাকবে না।

শ্রীকৃষ্ণ এক ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে বার্বরিকের পথ আগলে দাঁড়ান এবং তাঁর ক্ষমতার পরীক্ষা নিতে চান। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, "তুমি যদি সত্যিই বীর হও, তবে এই অশ্বত্থ গাছের প্রতিটি পাতা তোমার এক বাণে বিদ্ধ করে দেখাও।" বার্বরিক বাণ ছুঁড়লেন। বাণটি প্রতিটি পাতা বিদ্ধ করার পর শ্রীকৃষ্ণের পায়ের নিচে থাকা একটি পাতার ওপর গিয়ে থামল (যেটি শ্রীকৃষ্ণ পা দিয়ে চেপে রেখেছিলেন)। বার্বরিক হেসে বললেন, "প্রভু, পা সরিয়ে নিন, নইলে আপনার পা বিদ্ধ হবে।"

কেন যুদ্ধ লড়তে দেওয়া হয়নি বার্বরিককে?
কেন যুদ্ধ লড়তে দেওয়া হয়নি বার্বরিককে?

বার্বরিকের আত্মদান ও 'খাটু শ্যাম' মাহাত্ম্য

বার্বরিকের অজেয় ক্ষমতা দেখে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর কাছে 'দান' চাইলেন। বার্বরিক সানন্দে রাজি হলেন। শ্রীকৃষ্ণ তখন তাঁর মস্তক চাইলেন। বার্বরিক তৎক্ষণাৎ বুঝে গেলেন যে ইনি সাধারণ কোনো ব্রাহ্মণ নন। শ্রীকৃষ্ণ নিজের স্বরূপ প্রকাশ করলে বার্বরিক তাঁর মস্তক দান করতে সম্মত হন, তবে একটি শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি সম্পূর্ণ যুদ্ধটি স্বচক্ষে দেখতে চেয়েছিলেন।

শ্রীকৃষ্ণ তাঁর মস্তকটি একটি উঁচু পাহাড়ের ওপর স্থাপন করেন, যেখান থেকে বার্বরিক কুরুক্ষেত্রের ১৮ দিনের ভয়াবহ যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেন। যুদ্ধের শেষে যখন পাণ্ডবরা নিজেদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিবাদ করছিলেন, তখন বার্বরিকের মস্তক সাক্ষী দিয়ে বলেছিল যে— রণক্ষেত্রে কেবল শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্র ও মহামায়ার কৃপাই কাজ করছিল। শ্রীকৃষ্ণ বার্বরিকের ত্যাগে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বরদান করেন যে, কলিযুগে বার্বরিক শ্রীকৃষ্ণেরই এক নাম 'শ্যাম' হিসেবে পূজিত হবেন। আজ রাজস্থানের 'খাটু শ্যাম' মন্দির সেই ত্যাগী বীরের অমরত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছে।