আজ রঙের দিন হিসাবে স্বীকৃত হলেও পুরাণে বসন্তের রঙিন উৎসব হোলি বা দোলযাত্রার শুরুটা কিন্তু মোটেও রঙিন এবং উৎসবমুখর ছিল না। এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্যায় ও অহংকারের বিরুদ্ধে পরম সত্যের জয়ের এক অবিনশ্বর কাহিনী। ভাগবত পুরাণ অনুসারে, দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু, তাঁর বিষ্ণুভক্ত পুত্র প্রহ্লাদ এবং হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকাকে কেন্দ্র করেই প্রচলিত হয়েছে হোলিকা দহন-এর প্রথা।

কীভাবে অশুভ শক্তির প্রতীক হোলিকা ভস্মীভূত হয়েছিলেন এবং কেন আজও দোলযাত্রার আগের রাতে অগ্নিপ্রজ্বলন করা হয়, সেই কাহিনি অনেকেরই অজানা। জেনে নেওয়া যাক সেটি।
ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতিতে 'হোলিকা দহন' কেবল একটি লোকাচার নয়, এটি বিশ্বাসের এক সুদৃঢ় ভিত্তি। ভাগবত পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, অসুররাজ হিরণ্যকশিপু কঠোর তপস্যার মাধ্যমে ব্রহ্মার কাছ থেকে এক অদ্ভুত বর লাভ করেছিলেন। বরটি ছিল— কোনো মানুষ বা পশু তাঁকে মারতে পারবে না, দিনের বেলা বা রাতে তাঁর মৃত্যু হবে না, ঘরের ভেতরে বা বাইরে এবং কোনো অস্ত্রের সাহায্যেই তাঁকে বধ করা যাবে না।
এই অপরাজেয় ক্ষমতার অহংকারে মত্ত হয়ে হিরণ্যকশিপু নিজেকে ঈশ্বর বলে ঘোষণা করেন এবং রাজ্যে বিষ্ণুপূজা নিষিদ্ধ করেন। কিন্তু তাঁর নিজের পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর একনিষ্ঠ ভক্ত। পুত্রের এই বিষ্ণুভক্তি হিরণ্যকশিপু মেনে নিতে পারেননি।
{{/usCountry}}এই অপরাজেয় ক্ষমতার অহংকারে মত্ত হয়ে হিরণ্যকশিপু নিজেকে ঈশ্বর বলে ঘোষণা করেন এবং রাজ্যে বিষ্ণুপূজা নিষিদ্ধ করেন। কিন্তু তাঁর নিজের পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর একনিষ্ঠ ভক্ত। পুত্রের এই বিষ্ণুভক্তি হিরণ্যকশিপু মেনে নিতে পারেননি।
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: সুগ্রীবের স্ত্রী ছিলেন রুমা, তাঁর কারণেই দুই ভাইয়ের যুদ্ধ হয়! রামায়ণের এই নারীর গল্প অনেকেই জানেন না)
প্রহ্লাদকে মারার একের পর এক ব্যর্থ চেষ্টা
হিরণ্যকশিপু তাঁর পুত্রকে বারবার সাবধান করেন, কিন্তু শিশু প্রহ্লাদ ছিলেন তাঁর ভক্তিতে অটল। ক্ষুব্ধ পিতা প্রহ্লাদকে হত্যার জন্য পাহাড়ের চূড়া থেকে ফেলে দেওয়া, হাতি দিয়ে পিষ্ট করা এবং বিষধর সাপের ঘরে বন্দি করে রাখার মতো নানা নৃশংস পথ বেছে নেন। কিন্তু প্রতিবারই ভগবানের অলৌকিক কৃপায় প্রহ্লাদ অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসেন।
হোলিকা ও অগ্নি-পর্যায়ের পরিকল্পনা
সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে হিরণ্যকশিপু তাঁর বোন হোলিকার সাহায্য চান। হোলিকার কাছে একটি বিশেষ চাদর বা বস্ত্র ছিল, যা পরিধান করলে আগুন তাঁকে স্পর্শ করতে পারত না। পরিকল্পনা করা হলো, হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে বসবেন। হোলিকার চাদর তাঁকে রক্ষা করবে এবং প্রহ্লাদ আগুনেই ভস্মীভূত হবে।
নির্দিষ্ট দিনে বিশাল অগ্নিকুণ্ড প্রস্তুত করা হলো। প্রহ্লাদকে নিয়ে হোলিকা আগুনের ওপর বসলেন। কিন্তু অলৌকিকভাবে পরিস্থিতি বদলে গেল। প্রহ্লাদ যখন ভক্তিভরে বিষ্ণুর নাম জপ করছিলেন, তখন প্রবল বাতাসে হোলিকার গা থেকে সেই সুরক্ষাকবচ বা চাদরটি উড়ে গিয়ে প্রহ্লাদকে আবৃত করে ফেলল। ফলে আগুনে পুড়ে হোলিকার মৃত্যু হলো, আর প্রহ্লাদ সুস্থ শরীরে বেরিয়ে এলেন।
(আরও পড়ুন: জটায়ুর কথা তো সবাই জানেন, কিন্তু তাঁর দাদা সম্পাতির কাহিনিও দুর্দান্ত! সেই কথা অনেকেই জানেন না)
হোলিকা দহনের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
এই ঘটনার স্মরণে আজও দোলযাত্রার আগের রাতে ঘুঁটে, কাঠ এবং শুকনো পাতা দিয়ে প্রতীকী 'হোলিকা' বা খড়কুটোর স্তূপ তৈরি করে তাতে আগুন দেওয়া হয়। একে কোথাও 'ন্যাড়াপোড়া' আবার কোথাও 'হোলিকা দহন' বলা হয়।
- অহংকারের পতন: হোলিকা দহন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অধর্ম যতই শক্তিশালী হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত ধর্মেরই জয় হয়।
- শুদ্ধিকরণ: আগুনের শিখা যেমন পুরনো ময়লা পুড়িয়ে পরিষ্কার করে দেয়, তেমনই মানুষের মনের ভেতরের হিংসা ও দ্বেষ পুড়িয়ে ফেলার প্রতীক হলো এই অনুষ্ঠান।
হোলিকা দহনের পরদিন যখন ছাই শীতল হয়, তখন সেই আনন্দেই আবির ও রঙের খেলায় মেতে ওঠে মানুষ। এটি প্রমাণ করে যে সত্য ও শুদ্ধতা চিরকালীন।