বিষ্ণু, শিব নাকি দেবী তিলক? কোনটা কখন কাটা উচিত? জেনে নিন সনাতন ধর্মের ব্যাখ্যা
পূজা-পার্বণ, শুভ অনুষ্ঠান কিংবা প্রতিদিনের উপাসনায় তিলক ধারণের মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তি তার মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে সংহত করেন। ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র ও আয়ুর্বেদ বিজ্ঞানেও তিলক ধারণের গুরুত্ব অপরিসীম।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কপালে তিলক বা ফোঁটা কেবল একটি ধর্মীয় প্রথা বা সৌন্দর্যের অঙ্গ নয়, এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক চেতনার প্রতীক। পূজা-পার্বণ, শুভ অনুষ্ঠান কিংবা প্রতিদিনের উপাসনায় তিলক ধারণের মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তি তার মানসিক ও আধ্যাত্মিক শক্তিকে সংহত করেন। ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র ও আয়ুর্বেদ বিজ্ঞানেও তিলক ধারণের গুরুত্ব অপরিসীম।

তিলকের আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য এবং এর পেছনে থাকা জ্যোতিষতাত্ত্বিক কারণ জেনে নিন।
সনাতন ধর্মে তিলকের গুরুত্ব ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
হিন্দুশাস্ত্রে কপালকে শরীরের সবচেয়ে পবিত্র অংশ মনে করা হয়। দুই ভ্রুর মধ্যবর্তী স্থানকে বলা হয় 'আজ্ঞাচক্র'। তিলক মূলত এই আজ্ঞাচক্রের ওপরই লাগানো হয়। উপনিষদ অনুযায়ী, এই আজ্ঞাচক্র হলো মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বা প্রজ্ঞার কেন্দ্রস্থল। তিলক ধারণের মাধ্যমে এই কেন্দ্রকে জাগ্রত রাখা হয় এবং এর ফলে মন একাগ্র ও শান্ত থাকে।
তিলকের প্রকারভেদ
বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের উপাস্য দেবতা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন তিলক ধারণ করেন:
- বিষ্ণু তিলক (ঊর্ধ্ব পুণ্ড্র): বৈষ্ণবগণ চন্দনের মাধ্যমে কপালে 'V' আকৃতির তিলক পরেন, যা ভগবান বিষ্ণুর চরণের প্রতীক। এটি সাত্ত্বিক গুণের বিকাশ ঘটায়।
- শিব তিলক (ত্রিপুণ্ড্র): শৈবগণ কপালে তিনটি আড়াআড়ি রেখা বা ভস্মের তিলক আঁকেন। এটি ত্যাগের প্রতীক এবং জীবনের অনিত্যতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
- দেবী তিলক (বিন্দু): শক্তি উপাসকরা সাধারণত লাল চন্দন বা সিঁদুরের গোল তিলক পরেন, যা শক্তি ও তেজের প্রতীক।
ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি
জ্যোতিষশাস্ত্রে নবগ্রহের অবস্থান এবং তাদের কুপ্রভাব থেকে বাঁচতে তিলক ধারণকে একটি সহজ কিন্তু কার্যকরী প্রতিকার হিসেবে ধরা হয়। কপালে তিলক ধারণের স্থানটি মূলত বৃহস্পতি গ্রহের স্থান। তিলক পরলে কুণ্ডলীতে বৃহস্পতি মজবুত হয়।
১. মন ও মস্তকের শান্তি: চন্দনের তিলক কপালে লাগালে পিটুইটারি গ্রন্থি উদ্দীপিত হয়। জ্যোতিষ মতে এটি চন্দ্রের দোষ দূর করে এবং মানসিক অস্থিরতা কমায়।
২. গ্রহ দোষ খণ্ডন: জাফরান বা হলুদের তিলক বৃহস্পতিকে প্রসন্ন করে, যা বিদ্যা ও ভাগ্যোন্নতিতে সহায়তা করে। অন্যদিকে, লাল চন্দন বা সিঁদুরের তিলক মঙ্গল গ্রহের অশুভ প্রভাব কমিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
৩. নেতিবাচক শক্তি রোধ: জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী, কপালে তিলক থাকলে তা কবচের মতো কাজ করে। এটি কুদৃষ্টি বা বাইরের নেতিবাচক শক্তির হাত থেকে ব্যক্তিকে রক্ষা করে।
তিলক ধারণের বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ
আধুনিক শরীরবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, দুই ভ্রুর মাঝখানে থাকা আজ্ঞাচক্রের স্থানে একটি বিশেষ স্নায়ু কেন্দ্র থাকে। তিলক লাগানোর সময় এই স্থানে মৃদু চাপ পড়লে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং অনিদ্রা বা মাথাব্যথার মতো সমস্যা থেকে মুক্তি মেলে। এছাড়া তিলক পরলে নিজের প্রতি শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায় এবং এটি ব্যক্তিত্বে এক ধরণের গাম্ভীর্য ও পবিত্রতা নিয়ে আসে।
তিলক লাগানোর নিয়ম
তিলক সাধারণত ডান হাতের অনামিকা বা বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে লাগানো হয়। অনামিকা দিয়ে তিলক পরলে শান্তি মেলে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে পরলে আয়ু ও স্বাস্থ্য বৃদ্ধি পায় বলে শাস্ত্রে উল্লেখ আছে।
মনে রাখবেন
তিলক কেবল কপালে একটি দাগ নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষার একটি সূক্ষ্ম মাধ্যম। এটি যেমন আধ্যাত্মিক পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করে, তেমনই জ্যোতিষশাস্ত্রীয় প্রতিকার হিসেবেও অত্যন্ত ফলদায়ক। তাই তিলক ধারণের মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রজ্ঞা ও চেতনাকে প্রতিদিন জাগ্রত রাখতে পারি।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


