মহাদেবের তৃতীয় চোখের আগুনে এদিন পুড়ে গিয়েছিলেন কামদেব! কেন দোলের দিনেই এমন ঘটনা ঘটেছিল

দোলযাত্রার দিনেই মহাদেবের তৃতীয় নয়নের আগুনে ভস্ম হয়েছিলেন কামদেব। কেন এমন ঘটনা ঘটেছিল আজকের দিনেই? জেনে নিন সেই কাহিনি। 

Published on: Mar 3, 2026, 11:43:30 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

ভারতবর্ষের বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের মতো এখানে প্রতিটি উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোকগাথাগুলোও অনন্য। উত্তর ও পূর্ব ভারতে দোলযাত্রা বা হোলি মূলত শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা কিংবা প্রহ্লাদ-হোলিকার কাহিনির ওপর ভিত্তি করে পালিত হলেও, দক্ষিণ ভারতের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে এই দিনটি পরিচিত 'কামদহন' বা প্রেমের দেবতা কামদেবের আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে।

মহাদেবের তৃতীয় চোখের আগুনে এদিন পুড়ে গিয়েছিলেন কামদেব! কেন দোলের দিনেই
মহাদেবের তৃতীয় চোখের আগুনে এদিন পুড়ে গিয়েছিলেন কামদেব! কেন দোলের দিনেই

দক্ষিণ ভারতে প্রচলিত শিব ও কামদেবের এই অলৌকিক উপাখ্যান এবং দোলযাত্রার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য হয়তো অনেকেই জানেন না। কামদহনের সেই কাহিনি এখান থেকে জেনে নিন। জেনে নিন, কেন এই দিনটি প্রেমের ত্যাগের প্রতীক।

(আরও পড়ুন: কর্ণের কথা তো জানেন, কিন্তু তাঁর পুত্র বৃষসেনের কথা জানেন কি? তাঁর মৃত্যু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অন্যতম ট্র্যাজিক মুহূর্ত)

দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, কর্ণাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশের অনেক অংশে দোলযাত্রা বা হোলি পালিত হয় 'মনমথ দহন' বা কামদহন হিসেবে। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, এই দিনটিতেই দেবাদিদেব মহাদেবের কপালে থাকা তৃতীয় নয়নের অগ্নিশিখায় ভস্মীভূত হয়েছিলেন প্রেমের দেবতা কামদেব। এই ঘটনাটি কেবল একটি পৌরাণিক যুদ্ধ নয়, বরং এটি সৃষ্টি রক্ষার্থে প্রেমের এক মহান আত্মবলিদানের কাহিনি।

কামদহনের নেপথ্যে কাহিনি

পৌরাণিক বর্ণনা অনুসারে, সতী বিয়োগের পর মহাদেব গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়ে পড়েন। শোকাতুর শিবের এই তপস্যা ভাঙানোর সাধ্য কারো ছিল না। এদিকে তারকাসুর নামক এক শক্তিশালী দৈত্যের অত্যাচারে স্বর্গ-মর্ত্য প্রকম্পিত হয়ে উঠছিল। তারকাসুরকে বধ করার মতো শক্তি কেবল শিবের পুত্রেরই ছিল। কিন্তু মহাদেব ধ্যানে মগ্ন থাকায় দেবী পার্বতীর সঙ্গে তাঁর মিলন সম্ভব হচ্ছিল না।

দেবতাদের অনুরোধে এবং সৃষ্টির মঙ্গলের জন্য প্রেমের দেবতা কামদেব তাঁর ধনুক ও ফুলের বাণ নিয়ে শিবের ধ্যান ভঙ্গ করতে উদ্যত হন। বসন্তের মনোরম পরিবেশে কামদেব তাঁর 'পুষ্পবাণ' শিবের হৃদয়ে নিক্ষেপ করেন। এতে মহাদেবের ধ্যান ভঙ্গ হয় এবং তিনি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন। শিব তাঁর ললাটের তৃতীয় চক্ষু উন্মোচন করলে সেখান থেকে নির্গত অগ্নিশিখায় কামদেব মুহূর্তে ভস্মীভূত হয়ে যান।

(আরও পড়ুন: হোলিকা দহনের দিনে কী ঘটেছিল? কীভাবে ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় রক্ষা পান ভক্ত প্রহ্লাদ, জেনে নিন সেই গল্প)

প্রেমের ত্যাগ ও রতির প্রার্থনা

কামদেবের এই পরিণতির পর তাঁর পত্নী রতি দেবী শোকাকুল হয়ে শিবের কাছে প্রার্থনা করেন। তিনি মহাদেবকে জানান যে, কামদেব নিজের স্বার্থে নয়, বরং দেবতাদের ইচ্ছা এবং বিশ্বের কল্যাণের জন্য এই কাজ করেছেন। শিব যখন প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করেন, তখন তিনি বর দেন যে কামদেব জীবিত হবেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর কোনো শারীরিক রূপ থাকবে না—তিনি মানুষের মনে নিরাকার ভাব বা 'অনঙ্গ' হিসেবে অবস্থান করবেন।

দক্ষিণ ভারতে দোল পালনের রীতি

দক্ষিণ ভারতের মানুষ এই দিনটিকে কামদেবের ত্যাগের স্মরণে পালন করেন।

  • আগুন জ্বালানো: হোলিকা দহনের মতো সেখানেও এক বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করা হয়। একে বলা হয় 'কামদহনম'। বিশ্বাস করা হয়, মানুষের ভেতরের কাম, ক্রোধ ও মোহকে এই আগুনে পুড়িয়ে বিশুদ্ধ হতে হবে।
  • বিলাপ ও ভজন: অনেক জায়গায় কামদেবের স্মরণে শোকগীতি বা বিলাপ গাওয়ার প্রথা আছে, যা পরবর্তীতে বসন্তের আনন্দগানে রূপ নেয়।
  • সুগন্ধি ও আবির: এখানে রঙের খেলাকে কামদেবের পুষ্পবাণের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। ভক্তরা সুগন্ধি চন্দন ও আবির ব্যবহার করেন যা মনের কোমলতা ও প্রেমের প্রতীক।

(আরও পড়ুন: ন্যাড়াপোড়া শব্দটা এল কোথা থেকে? দোলযাত্রার আগের রাতে এটি করা হয় কেন)

আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

কামদহনের মূল শিক্ষা হলো—উচ্চতর লক্ষ্যের জন্য নিচু স্তরের প্রবৃত্তি বা লালসাকে দহন করা। কামদেব যখন শিবের রোষে পুড়ে গেলেন, তখন থেকে প্রেম কেবল শরীরী আকর্ষণ না থেকে এক আত্মিক ত্যাগের বিষয়ে পরিণত হলো। দক্ষিণ ভারতের দোলযাত্রা তাই কেবল আনন্দের নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল।

(আরও পড়ুন: দোলযাত্রায় শ্রীকৃষ্ণ বধ করেছিলেন কংসের প্রিয় অনুচরকে, নদীর ঘাটে সেদিন কী ঘটেছিল)

দোলযাত্রা আমাদের শেখায় যে, জীবনের বৈচিত্র্যময় রঙের পেছনে লুকিয়ে আছে ত্যাগের গভীর ইতিহাস। দক্ষিণ ভারতের এই কামদহন উৎসব প্রমাণ করে যে, প্রকৃত প্রেম অমর এবং তা যেকোনো ধ্বংসলীলার ঊর্ধ্বে। মহাদেবের রুদ্ররূপ আর কামদেবের কোমলতা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই পূর্ণতা পায় বসন্তের এই উৎসব।

  • Suman Roy
    ABOUT THE AUTHOR
    Suman Roy

    সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More