দোলযাত্রায় শ্রীকৃষ্ণ বধ করেছিলেন কংসের প্রিয় অনুচরকে, নদীর ঘাটে সেদিন কী ঘটেছিল
দোলযাত্রার দিনেই শ্রীকৃষ্ণের হাতে বধ হয়েছিল ভয়ঙ্কর কেশী অসুর। কী হয়েছিল এই দিনে? জেনে নিন সেই কাহিনি।
শ্রীকৃষ্ণের লীলাভূমি বৃন্দাবনে দোলযাত্রা বা হোলি কেবল রঙের উৎসব নয়, এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার এক অনন্য বিজয়গাথা। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, ফাল্গুনী পূর্ণিমার এই পবিত্র তিথিতেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কংসের প্রেরিত ভয়ংকর অসুর কেশী-কে বধ করেছিলেন। এই অলৌকিক ঘটনার স্মরণে আজও ভক্তরা আনন্দ ও আবিরে মেতে ওঠেন।

কেশী অসুর বধ এবং দোল উৎসবের গভীর সংযোগের কথা অনেকেই জানেন না। সেই কাহিনি এখান থেকে জেনে নিন।
(আরও পড়ুন: হোলিকা দহনের দিনে কী ঘটেছিল? কীভাবে ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় রক্ষা পান ভক্ত প্রহ্লাদ, জেনে নিন সেই গল্প)
দোলযাত্রা বা হোলিকা দহনের পটভূমিতে প্রহ্লাদ-হোলিকার কাহিনি সর্বাধিক প্রচলিত হলেও, ব্রজভূমিতে শ্রীকৃষ্ণের 'কেশী-নিসূদন' রূপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাগবত পুরাণ ও গর্গ সংহিতা অনুসারে, মথুরার অত্যাচারী রাজা কংস যখন জানতে পারেন যে যশোদানন্দন কৃষ্ণই তাঁর কাল, তখন তিনি একে একে বহু অসুরকে বৃন্দাবনে পাঠান। তাঁদের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী ও হিংস্র ছিলেন কেশী নামক অসুর।
ভয়ংকর কেশী অসুরের বৃন্দাবন আক্রমণ
কেশী অসুর ছিল মূলত একটি বিশালাকার ঘোড়ার রূপধারী দৈত্য। তার দাপটে পৃথিবী থরথর করে কাঁপত। কথিত আছে, কেশী যখন বৃন্দাবনে প্রবেশ করেন, তখন তার হ্রেষা ধ্বনিতে গোকুলের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল। তার খুরের আঘাতে মাটি ফেটে যাচ্ছিল এবং লেজের ঝাপটায় মেঘেরা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। বৃন্দাবনবাসীরা আতঙ্কে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হন।
শ্রীকৃষ্ণের বীরত্ব ও কেশী বধ
কেশী অসুর যখন শ্রীকৃষ্ণকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়, তখন ভগবান অত্যন্ত শান্ত চিত্তে তার সামনে দাঁড়ান। অসুরটি তার বিশাল মুখ ব্যাদান করে কৃষ্ণকে গিলে ফেলার চেষ্টা করে। ঠিক সেই মুহূর্তে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বাম হাতটি কেশীর মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দেন। অলৌকিকভাবে কৃষ্ণের হাতটি আগুনের গোলার মতো তপ্ত ও বিশালাকার হতে শুরু করে।
কেশীর শ্বাসনালী রুদ্ধ হয়ে যায় এবং শরীরের ভেতর প্রচণ্ড দহন অনুভব করে সে ছটফট করতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ভয়ংকর ঘোড়া-রূপী অসুরটি প্রাণত্যাগ করে। যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ কেশীকে বধ করেছিলেন, তাই তাঁর নাম হয় 'কেশী-নিসূদন'। যে স্থানে এই যুদ্ধ হয়েছিল, যমুনার সেই ঘাটটি আজও 'কেশী ঘাট' নামে সুপরিচিত।
(আরও পড়ুন: সুগ্রীবের স্ত্রী ছিলেন রুমা, তাঁর কারণেই দুই ভাইয়ের যুদ্ধ হয়! রামায়ণের এই নারীর গল্প অনেকেই জানেন না)
দোলযাত্রার সাথে এই ঘটনার সংযোগ
কেশী বধের এই ঘটনাটি ঘটেছিল ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে। কেশীর মতো এক প্রবল ও হিংস্র শত্রুর হাত থেকে মুক্তি পেয়ে বৃন্দাবনবাসী আনন্দে মেতে ওঠেন। তাঁরা আবির ও ফুলের পরাগ দিয়ে শ্রীকৃষ্ণকে অভিনন্দন জানান। অশুভ শক্তির বিনাশে প্রকৃতির বুকে যে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গিয়েছিল, তা-ই কালক্রমে দোলযাত্রা বা হোলি উৎসবে রূপান্তরিত হয়।
আধ্যাত্মিক তাৎপর্য
আধ্যাত্মিক বিচারে 'কেশী' অসুর হলো মানুষের মনের অহংকার ও দাম্ভিকতার প্রতীক। ঘোড়া যেমন দ্রুতগামী ও অবাধ্য হতে পারে, মানুষের অহংকারও তেমনই অনিয়ন্ত্রিত হলে ধ্বংস ডেকে আনে। শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক কেশী বধের অর্থ হলো ভক্তের হৃদয় থেকে অহংকার দূর করে সেখানে ভক্তির রঙ ছড়িয়ে দেওয়া। দোল উৎসবের আবির সেই ভক্তি ও প্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ।
(আরও পড়ুন: জটায়ুর কথা তো সবাই জানেন, কিন্তু তাঁর দাদা সম্পাতির কাহিনিও দুর্দান্ত! সেই কথা অনেকেই জানেন না)
বসন্তের এই পূর্ণিমায় যখন আমরা একে অপরকে আবিরে রাঙিয়ে দিই, তখন আমাদের মনে রাখা উচিত যে এটি কেবল আনন্দের উৎসব নয়, বরং অন্তরের অসুরকে বিনাশ করার এক সংকল্প। কেশী ঘাটের সেই পবিত্র স্মৃতি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঈশ্বর সর্বদা তাঁর ভক্তদের রক্ষা করেন এবং শেষ পর্যন্ত সত্যেরই জয় হয়।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


