কে ছিলেন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ? শ্যামাকালীর পুজোয় তাঁর অবদানের কথা অনেকেই জানেন না
বর্তমান সময়ে আমরা যে জগন্মাতা শ্যামাকালী বা দক্ষিণাকালীর মূর্তিপূজা করি, তার প্রচলন ও প্রসারের নেপথ্যে রয়েছে এই মহান সাধকের অবদান। বাংলার ঘরে ঘরে কালীপূজাকে জনপ্রিয় করে তোলা এবং তন্ত্রের জটিলতাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বাংলার তান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং শাক্ত সাধনার ইতিহাসে যার নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ। বর্তমান সময়ে আমরা যে জগন্মাতা শ্যামাকালী বা দক্ষিণাকালীর মূর্তিপূজা করি, তার প্রচলন ও প্রসারের নেপথ্যে রয়েছে এই মহান সাধকের অবদান। বাংলার ঘরে ঘরে কালীপূজাকে জনপ্রিয় করে তোলা এবং তন্ত্রের জটিলতাকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ এবং বাংলার তন্ত্রসাধনায় তাঁর অবদান জেনে নিন।
কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ: বাংলার কালী আরাধনার প্রবর্তক
কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ আনুমানিক ১৬শ শতাব্দীতে নবদ্বীপের এক পণ্ডিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষরা ছিলেন নিষ্ঠাবান স্মার্ত পণ্ডিত। তবে কৃষ্ণানন্দ ছিলেন জন্মগতভাবে সিদ্ধ তান্ত্রিক। সেই যুগে তন্ত্রসাধনা ছিল অত্যন্ত গোপন এবং মূলত পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসে করা কঠোর সাধনা। তিনি এই সাধনাকে সাধারণ মানুষের ভক্তি ও আরাধনার স্তরে নিয়ে আসেন।
দক্ষিণাকালীর রূপকল্প ও কৃষ্ণানন্দ
বাংলার লোকশ্রুতি অনুযায়ী, কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশই বর্তমানের জনপ্রিয় 'দক্ষিণাকালী' মূর্তির রূপকল্প তৈরি করেছিলেন। কথিত আছে, তিনি স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন যে পরদিন সকালে প্রথম যে নারীর রূপ তিনি দেখবেন, সেই রূপেই যেন দেবীর আরাধনা করা হয়। পরদিন সকালে তিনি এক গোয়ালিনীকে দেখেন, যিনি দেওয়ালে ঘুঁটে দিচ্ছিলেন। সেই নারীর গায়ের বর্ণ, আলুলায়িত কেশ এবং তাঁর লজ্জিত ভঙ্গি দেখেই কৃষ্ণানন্দ মায়ের বর্তমান রূপটি কল্পনা করেন।
তিনি দেবীর হাতে খড়্গ এবং মুণ্ড দিলেও, অপর দুই হাতে অভয় ও বর মুদ্রার বিন্যাস করেন, যা ভক্তের কাছে দেবীকে ভয়ংকরী নয় বরং বরাভয়দায়িনী মা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
'তন্ত্রসার' গ্রন্থ: তন্ত্রের আকর গ্রন্থ
কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তাঁর অমর সৃষ্টি 'তন্ত্রসার'। এটি কেবল একটি বই নয়, বরং তান্ত্রিক দর্শনের একটি কোষগ্রন্থ।
- সংকলন: তিনি শতাধিক দুর্লভ তান্ত্রিক পাণ্ডুলিপি এবং শাস্ত্র মন্থন করে এই গ্রন্থটি রচনা করেন।
- সহজপাঠ্যতা: প্রাচীনকালে তন্ত্র ছিল অত্যন্ত জটিল ও ভ্রান্ত ধারণা মিশ্রিত। কৃষ্ণানন্দ সেই জটিলতা দূর করে মূর্তিপূজা, যন্ত্র এবং মন্ত্রের একটি বিধিবদ্ধ নিয়ম তৈরি করেন।
- সমন্বয়: তিনি তন্ত্রের সাথে ভক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন, যা বাংলায় শাক্ত ধর্মের পুনর্জাগরণ ঘটায়।
বাংলার তন্ত্রসাধনায় তাঁর ভূমিকা ও প্রভাব
কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ কেবল একজন সাধক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক।
১. কালীপূজার সার্বজনীনতা: তাঁর আগে কালী আরাধনা মূলত শ্মশানে বা নির্জন স্থানে সাধকরাই করতেন। কৃষ্ণানন্দের প্রচেষ্টায় গৃহস্থের অন্দরমহলে কালী মূর্তিপূজা শুরু হয়। কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যায় কালীপূজার ব্যাপক প্রচলন তাঁরই উত্তরসূরিদের হাত ধরে বিকশিত হয়েছে।
২. নবদ্বীপের তান্ত্রিক ধারা: নবদ্বীপ ছিল তখন বৈষ্ণব ধর্মের কেন্দ্রস্থল। কৃষ্ণানন্দ সেখানে শাক্ত ও তান্ত্রিক ধারার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছিলেন।
৩. পরবর্তী সাধকদের পথপ্রদর্শক: রামপ্রসাদ সেন থেকে শুরু করে শ্রীরামকৃষ্ণ—পরবর্তীকালের প্রায় সমস্ত শাক্ত সাধকই কৃষ্ণানন্দের 'তন্ত্রসার' এবং তাঁর প্রদর্শিত আরাধনার পদ্ধতি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।
কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ছিলেন সেই আলোকবর্তিকা, যিনি বাংলার আদিম তান্ত্রিক জ্ঞানকে সাধারণ মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। আজ বাংলার প্রতিটি পাড়ায় বা ঘরে যে মায়ের পূজা হয়, তার মূলে রয়েছে এই মহাবৈরাগী সাধকের নিষ্ঠা। তিনি বাংলার মাটিকে প্রকৃত অর্থেই 'কালীক্ষেত্র' হিসেবে পরিচিতি দিয়েছেন।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


