ভয়ংকরী নন, বরং তিনি পরম সত্যের প্রকাশ! তবু কেন দেবী ভৈরবীকে সকলে ভয় পান
। তাঁর নাম শুনলেই অনেকের মনে ভয়ের উদ্রেক হয়, কিন্তু সাধকদের কাছে তিনি পরম করুণাময়ী জননী। ভৈরবীর স্বরূপ এবং তাঁর আরাধনার কঠিন নিয়মাবলি নিয়ে ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র ও শক্তিবাদ বহু কিছু বলেছে।
সনাতন ধর্ম ও তন্ত্রশাস্ত্রের নিগূঢ় রহস্যে আবৃত দশমহাবিদ্যার পঞ্চম রূপ হলেন মা ভৈরবী। তিনি প্রলয়ঙ্করী, তিনি তেজস্বিনী। তাঁর নাম শুনলেই অনেকের মনে ভয়ের উদ্রেক হয়, কিন্তু সাধকদের কাছে তিনি পরম করুণাময়ী জননী। ভৈরবীর স্বরূপ এবং তাঁর আরাধনার কঠিন নিয়মাবলি নিয়ে ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্র ও শক্তিবাদ (Shaktism) কী বলছে, জেনে নিন।

দেবী ভৈরবী কে? শক্তিবাদ ও শাস্ত্রের ব্যাখ্যা
'ভৈরবী' শব্দের অর্থ হলো যা ভয়ংকর বা যা থেকে ভয়ের উৎপত্তি। শক্তিবাদ অনুযায়ী, তিনি মহাকালের সংহারিণী শক্তি। যখন সৃষ্টি বিনাশের পথে যায় বা অধর্ম মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে, তখন দেবী ভৈরবী আবির্ভূত হন। তিনি উদীয়মান সূর্যের মতো রক্তবর্ণা, তাঁর হাতে জপমালা, কিতাব এবং বর ও অভয় মুদ্রা থাকে।
মহাজাগতিক বিচারে, দেবী ভৈরবী আমাদের ভেতরে সুপ্ত থাকা **'কুণ্ডলিনী শক্তি'**র প্রতীক। তিনি কেবল বিনাশ করেন না, বরং বিনাশের মাধ্যমে নতুন সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করেন। তিনি কালভৈরব বা মহাকালের অর্ধাঙ্গিনী।
কেন তাঁকে সকলে ভয় পান?
দেবী ভৈরবীর রূপ এবং তাঁর ক্ষমতার প্রখরতার কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের ত্রাস কাজ করে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
১. পরিবর্তনের দেবতা: ভৈরবী মানেই হলো আমূল পরিবর্তন। তিনি মানুষের অহংকার, মায়া এবং আসক্তিকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেন। এই 'আমিত্ব' বিনাশের প্রক্রিয়া সাধারণ মানুষের কাছে যন্ত্রণাদায়ক ও ভয়ংকর মনে হয়।
২. মৃত্যু ও বিনাশের নিয়ন্ত্রক: তিনি শ্মশানবাসিনী। যেখানে সাধারণ মানুষ যেতে ভয় পায়, দেবী সেখানেই বিরাজ করেন।
৩. উগ্র তেজ: শাস্ত্রমতে, ভৈরবীর তেজ সহ্য করার ক্ষমতা সবার থাকে না। তাঁর উপাসনায় সামান্য ত্রুটি হলে হিতে বিপরীত হওয়ার লোককথা প্রচলিত আছে।
দেবী ভৈরবীর পুজোয় যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হয়
মা ভৈরবীর আরাধনা আর পাঁচটা সাধারণ দেবীর পুজোর মতো নয়। এটি অত্যন্ত কঠিন এবং নিয়মনিষ্ঠ:
- মানসিক শুদ্ধি: ভৈরবী অন্তরের সত্যতা পছন্দ করেন। মনে কোনো কপটতা বা অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁর পুজো করলে বড় ধরণের মানসিক বা শারীরিক বিপর্যয় আসতে পারে।
- সঠিক উচ্চারণ: তাঁর বীজ মন্ত্র অত্যন্ত শক্তিশালী। কোনো অভিজ্ঞ গুরুর পরামর্শ ছাড়া একা একা তাঁর মন্ত্র জপ করা নিষিদ্ধ।
- সমর্পণ: এই পুজোয় নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করতে হয়। ভৈরবী সাধক হওয়ার অর্থ হলো সংসারের সমস্ত মায়া ত্যাগ করার মানসিক প্রস্তুতি থাকা।
উগ্র সাধনা বনাম সাত্ত্বিক ভাব: গৃহস্থদের জন্য সাধারণত দেবীর উগ্র তান্ত্রিক রূপের পুজো নিষেধ করা হয়। বাড়িতে তাঁর 'শান্ত' বা 'সাত্ত্বিক' ছবির সামনে ভক্তিভরে প্রণাম জানানোই নিরাপদ।
ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি
জ্যোতিষশাস্ত্রে দেবী ভৈরবীর প্রভাব অত্যন্ত গভীর:
- রাহু ও মঙ্গলের প্রতিকার: যাদের কুণ্ডলীতে লগ্ন বা রাশিতে মঙ্গল ও রাহুর অশুভ দশা রয়েছে, তাদের জন্য দেবী ভৈরবীর উপাসনা অত্যন্ত ফলদায়ক। তিনি আকস্মিক দুর্ঘটনা এবং অপমৃত্যু থেকে জাতককে রক্ষা করেন।
- বাক-সিদ্ধি ও বুদ্ধি: জ্যোতিষীদের মতে, ভৈরবীর কৃপা থাকলে জাতকের বাক-সিদ্ধি ঘটে এবং তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী হন।
- নেতিবাচক শক্তি বিনাশ: অশুভ নজর দোষ বা কালো জাদুর (Black Magic) প্রভাব কাটাতে ভৈরবীর কবচ বা মন্ত্র জাদুর মতো কাজ করে।
দেবী ভৈরবী ভয়ংকরী নন, বরং তিনি পরম সত্যের প্রকাশ। তিনি অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখান। তবে তাঁর শক্তি যেহেতু অগ্নির মতো প্রখর, তাই যথাযথ জ্ঞান ও গুরুর নির্দেশনা ছাড়া তাঁর সাধনায় অবতীর্ণ হওয়া অনুচিত।
E-Paper











