বসন্তের রঙিন উৎসব দোলযাত্রা বা হোলি বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা কিংবা অশুভ শক্তির বিনাশের কাহিনি। কিন্তু ভারতের অন্যতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ওড়িশা এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলে দোলযাত্রার সূচনার পেছনে কেবল ধর্মীয় কারণই নয়, বরং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ ও বৈজ্ঞানিক ইতিহাস লুকিয়ে আছে। প্রাচীনকালে মূলত চর্মরোগ প্রতিরোধ এবং বসন্তকালীন শারীরিক অসুস্থতা সারানোর উদ্দেশ্যেই ভেষজ 'ফাগু' বা আবির খেলার প্রচলন হয়েছিল।

(আরও পড়ুন: দোলযাত্রায় শ্রীকৃষ্ণ বধ করেছিলেন কংসের প্রিয় অনুচরকে, নদীর ঘাটে সেদিন কী ঘটেছিল)
ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী উৎসবের তালিকায় দোল বা 'ফাগু দশমী' এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। আধুনিক যুগে আমরা যে রাসায়নিক আবির দেখি, প্রাচীনকালে তার অস্তিত্ব ছিল না। তখন আবির তৈরি হতো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভেষজ উপাদান দিয়ে। ঐতিহাসিক ও লোকগবেষকদের মতে, ঋতু পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে চর্মরোগের প্রকোপ কমাতে এই ভেষজ গুলাল বা ফাগু ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়।
ঋতু পরিবর্তন ও চর্মরোগের প্রকোপ
বসন্তকাল হলো শীত ও গ্রীষ্মের মিলনস্থল। এই সময়ে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার দ্রুত পরিবর্তন ঘটে, যা মানবদেহে ব্যাক্টেরিয়া ও ভাইরাসের সংক্রমণের আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। বিশেষ করে জলবসন্ত (Smallpox), হাম (Measles) এবং বিভিন্ন ধরণের চর্মরোগ (Skin Infections) এই সময়ে মারাত্মক আকার ধারণ করত। ওড়িশার প্রাচীন চিকিৎসকরা লক্ষ্য করেছিলেন যে, নির্দিষ্ট কিছু ভেষজ উপাদান শরীরের সংস্পর্শে এলে ত্বকের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।
(আরও পড়ুন: ন্যাড়াপোড়া শব্দটা এল কোথা থেকে? দোলযাত্রার আগের রাতে এটি করা হয় কেন)
ফাগু বা আবিরের ভেষজ উপাদান
{{/usCountry}}(আরও পড়ুন: ন্যাড়াপোড়া শব্দটা এল কোথা থেকে? দোলযাত্রার আগের রাতে এটি করা হয় কেন)
ফাগু বা আবিরের ভেষজ উপাদান
{{/usCountry}}প্রাচীন ওড়িশায় দোলযাত্রার আবির বা ফাগু তৈরি হতো মূলত নিচের উপাদানগুলো দিয়ে:
- পলাশ ও শিমুল ফুল: লাল ও গেরুয়া রঙের জন্য এই ফুলের পাপড়ি শুকিয়ে গুঁড়ো করা হতো। পলাশ ফুলের রস ত্বকের ক্ষত সারাতে এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে অত্যন্ত কার্যকর।
- হলুদ ও নিমের গুঁড়ো: অ্যান্টি-সেপটিক হিসেবে হলুদের ব্যবহার সর্বজনবিদিত। নিমের পাতা শুকিয়ে তৈরি করা সবুজ ফাগু ত্বকের চুলকানি ও বসন্তের দাগ দূর করতে ব্যবহৃত হতো।
- চন্দন ও বেল পাতা: শরীরকে শীতল রাখতে এবং ত্বকের জ্বালা কমাতে চন্দন ও বেলের নির্যাস মেশানো হতো।
(আরও পড়ুন: হোলিকা দহনের দিনে কী ঘটেছিল? কীভাবে ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় রক্ষা পান ভক্ত প্রহ্লাদ, জেনে নিন সেই গল্প)
ওড়িশার দোল এবং ভেষজ স্নান
ওড়িশায় ভগবান জগন্নাথের দোল উৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ভেষজ রঙের ব্যবহার। মন্দিরে দেবতাকে ফাগু অর্পণের পর সেই প্রসাদী আবির ভক্তরা একে অপরের গায়ে মাখতেন। মনে করা হতো, এই পবিত্র ফাগু শরীরে মাখলে সারা বছর কোনো চর্মরোগ হবে না। অনেক জায়গায় দোল পূর্ণিমার পরদিন নিম ও নিসিন্দা পাতার জল দিয়ে স্নান করার রীতি আজও প্রচলিত, যা মূলত একটি প্রাকৃতিক শোধন প্রক্রিয়া বা 'ডিটক্স'।
চিকিৎসা থেকে উৎসবে রূপান্তর
কালের নিয়মে এই ভেষজ চিকিৎসাপদ্ধতিটি সামাজিক মেলামেশার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। মানুষ যখন একে অপরকে ভেষজ রঙে রাঙিয়ে দিতে শুরু করল, তখন তার মধ্যে তৈরি হলো ভ্রাতৃত্ব ও আনন্দের পরিবেশ। ওড়িশার 'মেলাণ' উৎসব বা গ্রাম বাংলার দোলযাত্রা—সব জায়গাতেই এই রঙের খেলাটি আসলে শরীর ও মনকে সতেজ করার এক যৌথ প্রয়াস ছিল।
(আরও পড়ুন: মনে করা হয়, তিনি ব্রহ্মবিদ্যার প্রতীক, সত্যের পথ দেখান! কে এই দেবী বিশালাক্ষী? কী তাঁর কাহিনি)
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা রাসায়নিক রঙের ক্ষতিকর প্রভাবে ত্বকের সমস্যায় ভুগছি, তখন ওড়িশার এই প্রাচীন ইতিহাস আমাদের পুনরায় প্রকৃতির কাছে ফেরার বার্তা দেয়। দোলযাত্রা কেবল রঙের উৎসব নয়, এটি প্রকৃতির দানকে গ্রহণ করে শরীরকে রোগমুক্ত রাখার এক মহান ঐতিহ্য। এবারের দোলে আমরা যদি সেই প্রাচীন ভেষজ আবিরের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে পারি, তবেই এই উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা বজায় থাকবে।